শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

চাচাতো বোন যখন বউ

মে ১৬, ২০২৬ 0
চাচাতো বোন যখন বউ
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। গ্রামের বাড়ির উঠানে শীতের হালকা কুয়াশা নেমেছে। দূরে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ছে। উঠানের এক পাশে বসে ছিল আসিফ। হাতে চায়ের কাপ, কিন্তু মনটা যেন অন্য কোথাও। ছোটবেলা থেকেই নীলাকে সে চিনত। চাচাতো বোন—একসাথে বড় হওয়া, ঝগড়া, ঈদের নতুন জামা দেখানো, স্কুলে যাওয়ার পথে খুনসুটি—সবকিছুতেই ছিল নীলা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের ভেতরে অদ্ভুত এক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিল। সেটা কেউ মুখে বলেনি, শুধু চোখে চোখে লুকিয়ে ছিল। একদিন হঠাৎ পরিবারের সবাই সিদ্ধান্ত নিল—আসিফ আর নীলার বিয়ে হবে। খবরটা শুনে আসিফ অবাক হয়েছিল, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন অদ্ভুত এক শান্তি কাজ করছিল। নীলা অবশ্য প্রথমে লজ্জায় কারও সামনেই আসেনি। সারাদিন নিজের ঘরে ছিল। বিয়ের দিন পুরো বাড়ি আলোয় ঝলমল করছিল। আত্মীয়স্বজন, হাসি, কোলাহল—সবকিছুর মাঝেও আসিফের চোখ শুধু একজনকেই খুঁজছিল। লাল শাড়িতে যখন নীলাকে আনা হলো, তখন আসিফ কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গিয়েছিল। এ কি সেই ছোট্ট মেয়েটা, যে একসময় তার সঙ্গে আম চুরি করত? বাসর রাতে ঘরে ঢুকে আসিফ দেখল, নীলা মাথা নিচু করে বসে আছে। চারপাশে ফুলের গন্ধ। আসিফ হেসে বলল, — “এই যে, এত চুপ কেন?” নীলা ধীরে বলল, — “অদ্ভুত লাগছে… ছোটবেলার সঙ্গীটা আজ আমার স্বামী।” আসিফ একটু কাছে গিয়ে বলল, — “আমার কাছেও। তবে একটা জিনিস বদলায়নি।” — “কি?” — “তুমি এখনও আমার সবচেয়ে আপন মানুষ।” নীলা মুখ তুলে তাকাল। চোখে মায়া আর লাজুক হাসি। সেই মুহূর্তে তাদের সম্পর্কটা শুধু চাচাতো ভাইবোনের স্মৃতিতে আটকে থাকল না, নতুন এক জীবনের শুরু হয়ে গেল। বিয়ের পরের দিনগুলোতে তাদের বন্ধুত্বটাই আরও গভীর হলো। সকালে একসাথে চা খাওয়া, ছাদে হাঁটা, পুরোনো গল্প নিয়ে হাসাহাসি—সবকিছু যেন নতুন রঙ পেল। এক রাতে নীলা বলল, — “জানো, আমি সবসময় ভয় পেতাম, বিয়ের পর মানুষ বদলে যায়।” আসিফ হেসে উত্তর দিল, — “তাহলে আমরা বদলাব না। আমরা আগে যেমন বন্ধু ছিলাম, এখনও তেমনই থাকব।” জানালার বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছিল। আর ভেতরে, দুজন মানুষের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ নিচ্ছিল।

শুক্রবার, ১৪ মার্চ, ২০২৫

আসাদ ও পিয়ার ভালোবাসার গল্প

মার্চ ১৪, ২০২৫ 0
আসাদ ও পিয়ার ভালোবাসার গল্প
### **আসাদ ও পিয়ার ভালোবাসার গল্প** শহরের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু গল্প থাকে, যা মনে দাগ কাটে, হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে যায়। আসাদ ও পিয়ার গল্প তেমনই এক ভালোবাসার গল্প, যেখানে ভালোবাসা কেবল কথা নয়, বরং প্রতিটি মুহূর্তের এক নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি। #### **শুরুটা...** আসাদ ছিল শান্ত স্বভাবের, বই পড়তে ভালোবাসতো, আর স্বপ্ন দেখতো একদিন অনেক বড় কিছু করবে। অন্যদিকে, পিয়া ছিল প্রাণবন্ত, হাসি-খুশি আর দুষ্টুমি করতেই বেশি পছন্দ করতো। দুজনের স্বভাব একদম বিপরীত, কিন্তু তবুও কেমন যেন একটা আকর্ষণ ছিল তাদের মধ্যে। একদিন কলেজের লাইব্রেরিতে আসাদের সাথে পিয়ার প্রথম দেখা। পিয়া আসাদকে জিজ্ঞেস করলো, — "এই বইটা কি তুমি শেষ করেছ?" — "হ্যাঁ, খুবই ভালো একটা বই। তুমি পড়বে?" — "হুম! কিন্তু তুমি রিকমেন্ড করছো, মানে এটা নিশ্চয়ই খুব সিরিয়াস টাইপের বই, তাই না?" এইভাবেই শুরু। বই থেকে গল্প, গল্প থেকে বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্ব থেকে…? #### **ভালোবাসার স্বীকারোক্তি** পিয়া ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, আসাদের প্রতি তার অনুভূতি বিশেষ কিছু। সে লুকিয়ে লুকিয়ে আসাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো, আর আসাদ? সে বুঝতে পারছিল, কিন্তু সাহস করছিল না কিছু বলার। একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল, পিয়া ছাতা ছাড়াই দাঁড়িয়ে ছিল কলেজের গেটের সামনে। আসাদ কাছে এসে বললো, — "তুমি কি ছাতা আনোনি?" — "না, বৃষ্টি ভিজতে ভালো লাগে!" — "সর্দি-কাশি হলে?" — "তুমি যদি পাশে থাকো, তাহলে অসুস্থ হলেও সমস্যা নেই!" আসাদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর আস্তে করে বললো, — "তাহলে আমি সারাজীবন তোমার পাশে থাকতে চাই। তুমি কি চাও?" পিয়া এক ঝলক হাসলো, তারপর বৃষ্টির মাঝে হাত বাড়িয়ে বললো, — "তাহলে শুরু হোক আমাদের গল্প!" #### **শেষ নাকি শুরু?** ভালোবাসার গল্প কখনও শেষ হয় না, শুধু নতুন নতুন অধ্যায় যোগ হয়। আসাদ আর পিয়া তাদের গল্পটা একসাথে লিখতে শুরু করলো, যেখানে বৃষ্টি থাকবে, বই থাকবে, আর থাকবে একে অপরের প্রতি নির্ভরতা। তাদের গল্প কি তোমার ভালো লেগেছে? যদি তোমার নিজের জীবনে এমন কোনো গল্প থেকে থাকে, শেয়ার করতে পারো!

বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২০

111 প্রেমময় আমি আপনাকে ব্যথা প্রশংসা উদ্ধৃতি by Asad Rahman

মার্চ ০৫, ২০২০ 0
111 প্রেমময় আমি আপনাকে ব্যথা প্রশংসা উদ্ধৃতি by Asad Rahman
আপনি কি আপনার উল্লেখযোগ্য অন্যটি মিস করছেন? দুর্ভাগ্যক্রমে, আপনার প্রিয়জনকে বাদ দেওয়া অনেক সম্পর্কের একটি অংশ। আপনি একে অপরকে আবার দেখা না হওয়া পর্যন্ত দিনগুলি সংক্ষিপ্ত করতে আপনাকে সহায়তা করার জন্য আমরা উত্সাহের এই দুর্দান্ত নির্বাচনটি করেছি এবং আমি আন্তরিকভাবে আপনাকে উদ্ধৃতিগুলি মিস করছি। আপনার প্রিয়জন দূরে থাকাকালীন কেন একটি শুভ সকাল বার্তা দিয়ে অবাক করবেন না? যদি আপনার সঙ্গী কোনও ব্যবসায় ভ্রমণে আসে, আপনি যদি দীর্ঘ দূরত্বের সম্পর্কের মধ্যে থাকেন তবে আপনার প্রিয়জন যখন শারীরিকভাবে কাছের না হন তখন খুব চ্যালেঞ্জ হতে পারে। আপনি একা অনুভব করতে পারেন এবং আপনার অর্ধেক থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারেন - দেখতে, শুনতে, স্পর্শ করতে এবং গন্ধ পেতে অক্ষম। আপনি যদি আপনার আরও ভাল অর্ধেকের বিষয়ে চিন্তাভাবনা বন্ধ করতে পারেন তবে নীচের উদ্ধৃতিগুলি আপনাকে আবার উত্সাহিত করবে। "তারা বলেছে যে আপনি যখন কাউকে মিস করেন তখন সম্ভবত তারাও একইভাবে অনুভব করেন তবে আমি মনে করি না যে এই মুহুর্তে আমি আপনাকে যতটা মিস করছি ততই আপনি আমাকে মিস করতে পারবেন না।" এডনা সেন্ট ভিনসেন্ট মিল আপনার দুজনকে পরের দুই দিন বা এক সপ্তাহ এমনকি একসাথে থাকতে পারে না তা জেনে বেদনাদায়ক অনুভূতি। পিক্সিল্যাটেড স্কাইপ কল এবং সংক্ষিপ্ত ফোন কলগুলির সাথে বাস্তব জীবনের মিথস্ক্রিয়াগুলি প্রতিস্থাপন করার সময়, মনে হয় যে এটি আপনাকে নেওয়া হয়েছিল এটি আপনার পক্ষে সবচেয়ে মূল্যবান।

সোমবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২০

চাচাতো বোন যখন বউ/asadrahman

জানুয়ারি ২৭, ২০২০ 0
চাচাতো বোন যখন বউ/asadrahman
চাচাতো বোন যখন বউ" (part:2) কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে গিয়েছিলাম নুসরাতের রুমে, গিয়ে দেখি উনি Tik Tok ভিডিও বানাতে ব্যস্ত...।তাই দরজার সামনে গিয়ে শাহরুখ খানের মতো স্টাইল নিয়ে... এ এ এ "ছোঁওয়াগাত নেহি কারোগি হামারা...? নুসরাত আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে এক মিনিট দাড়া নড়বি না, ছোওয়াগাত করতেছি তকে। তারপর পাশে থেকে একটা জুতা নিয়ে ঠাস করে আমার দিকে ছুরে মারলো। এরপরের বার রুমের সামনে আসলে.. ঝাড়ুছে কারোংগি তেরি ছোওয়াগাত....।এর পর পরই মুখের উপর ধারাম করে দরজা টা বন্ধ করে দিলো ইজ্জত কি ফালুদা বানা দিয়া রে.. ।আশে পাশে ঘুরে দেখলাম কেও আবার দেখে ফেললো নাকি।বলা তো যায় না কে আবার ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে ছেরে দিবে।এ সমস্ত ভিডিও ভাইরাল করতে তো আপনাদের আবার সময় লাগে না.. ।না, আশে পাশে কেউ নেই ভেবে যেই একটা স্বস্তির দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়তে যাবো ঠিক তখনি তাকিয়ে দেখি কাজের মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে হাসতেছে।আমি সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম কি হয়েছে হাসতেছো কেন..? কাজের মেয়েঃআমি সব দেখে ফেলেছি দাদা ভাই.. আমিঃএই রে, এইবার ইজ্জত নিলামে উঠবে শিওর।আমাদের কাজের মেয়েটাকে সবাই বি বি এস খবরবার্তা বলে।কারন ও সব কিছু 5G স্পিডে ছড়িয়ে দিতে উস্তাদ। তখন মাথায় ঘুরে ফিরে একটা গানই বাজতেছিলো"লুট গায়া ম্যা লুট গায়া"।ইজ্জতের মায়া ছেরে রুমে গিয়ে ফেসবুক টা লগইন করলাম।আহা কতো সুন্দর সুন্দর মেয়ে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে, বিয়ের পর আর এদের সাথে কথা বলতে পারবো না ভেবেই আবেগে বুক হালকা হয়ে গেলে থুক্কু ভারি হয়ে গেলো।এসব কথা চিন্তা করে করে কখন যে ঘুমিয়ে পরলাম বুঝতেই পারলাম না।ঘুম ভাঙতেও বেশী সময়ের প্রয়োজন হলো না,ধারাম করে এক গাদা পানি উড়ে এসে আমার উপরে পরলো। তাকিয়ে দেখি নুসরাত। আমিঃএগুলার মানে কি...? নুসরাতঃতর জন্য চা এনেছি... আমি:চা এনেছিস ভালো কথা তাই বলে এ ভাবে ঘুম ভাঙাবি..?দে.... নুসরাত: কি..? আমি: চা টা দে.. নুসরাতঃএই নে আমি একটু মুখে দিয়ে... আমি:বেআক্কেল মেয়ে ১৮ বছর হয়ে গেছে এখনো লবন আর চিনির পার্থক্য বুঝস না।চায়ে লবন না,চিনি দিতে হয় এ গুলা কেও তকে শিখায় নাই..? নুসরাত:চায়ে লবন ইচ্ছা করেই দিছি। এখন থেকে এগুলাই তর কপালে আছে।যতো তাড়াতাড়ি অভ্যাস করতে পারবি তর জন্য ততোই ভালো...বায় এখন ঘুমিয়ে থাক। আজব মাইয়া।পানি দিয়ে গোসল করিয়ে এখন বলে ঘুমিয়ে থাক।কি আর করার ভেজা শরিরে তো আর থাকা যাচ্ছে না তাই সকাল সকাল গোসল টা করেই ফেললাম। শীতের সকালে গোসল করার স্বাদ একমাত্র স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরাই বলতে পারবে।এমন ভাবে কাপতেছিলাম মনে হচ্ছিলো শরিরের প্রতিটা পেশিকোষে কেও ১১০০০ হাজার বোল্ডের বিদ্যুৎ এর শক দিতেছে। রেডি হয়ে নিচে চলে গেলাম নাস্তা করতে। হঠাৎ ফোন আসলো মেঝু চাচা,মেঝুচাচি দেশে আসতেছে।তাদের আনতে বিমানবন্দরে যেতে হবে। দুপুরের খাবার খেয়ে ছোট চাচাতো ভাই টাকে নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম।কিছু সমস্যার জন্য চাচা-চাচির ফ্লাইট ৩ ঘন্টা পিছিয়ে গেছে।কি আর করার, গাড়িতে বসে টিভি দেখে সময় পার করে দিলাম।অত:পর ১০:৪০ এ চাচা চাচি কে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম এবং ১১:৫৫ তে বাসায় পৌছে গেলাম।বাসায় গিয়ে মোবাইল চার্জদিতে গিয়ে দেখি চার্জার গায়েব।কে গায়েব করেছে তা এখন ভাবার সময় নেই,বউয়ের অবস্থা খারাপ যে কোন সময় দম বের হয়ে যাবে মাত্র ৩% চার্জ আছে।হঠাৎ মাথায় আসলো নুসরাতের দুইটা চার্জার একটা সিস্টেম করতে পারলেই আমার কাজ চলে যাবে।চোরের মতো নুসরাতে ঘড়ে প্রবেশ করে যেই চার্জার আনতে গেছি আর তখনি নুসরাত চলে এসেছে..।জান বাচাতে দিলাম অলম্পিকে ৮০০ মিটারের দৌড়, পায়ে লেগে নুসরাতের রাঙামাটি থেকে আনানো শখের ফুলেরটব টা ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো।ভয়ে আমার হার্ট টা যেন বের হয়ে আসতেছিলো।বুঝতে পারতেছেন ধরতে পারলে ও আমার কি হালটাই না করবে...জান বাচাতে ছাদে গিয়ে পালাইছিলাম কিন্তু নুসরাত তো নাছোড়বান্দা জানে আমি ভূত কে অনেক ভয় পাই তাই আমাকে কিছু না বলে, চিলেকোঠার দরজাটাই লক করে দিয়ে গেছে। যাওয়ার সময় আবার বলে গেছে বেস্ট অব লাক।এখন আমি ছাদে বসে গল্প লেখতেছি।দোয়া করবেন বেচে থাকলে পরের পর্বদিবো। .

বুধবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২০

হঠাৎ দেখা ২০২০

জানুয়ারি ১৫, ২০২০ 0
হঠাৎ দেখা ২০২০
০১. সেদিন দেখেছিলুম লাল বেনারসিতে, চোখে ছিল গাঢ় কাজল, মাথার চুলে ছিল সোনার টিকলি। বেনারসির আচঁলটা ঘোমটা দিয়ে তুলা ছিল মাথায়। বেশ মানিয়েছিলো তাকে। একবার তাকালে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝলুম এত আয়োজনের মধ্যেও দৃষ্টিতে তার আগুন ঝরা শূন্যতা, সেই শূন্যতায় মুরুভূমির মতো তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো কিসের অপেক্ষায় ডেবে গিয়েছে ভেতরে, অদূরে চেয়ে আছে দিগন্তের লাল রঙের দিকে । সেই অঙ্কিতা, যাকে দেখেছিলুম লাল বেনারসিতে, কপালে আঁকা ছিল টিপ; মাথায় তুলা ছিলো লাল বেনারসির ঘোমটা, তাকে আজ দেখলুম বিধবার সাদা শাড়িতে ! কেমন যেন বড্ড বেমানান লাগছে চোখে। আগের থেকে শুকিয়ে গেছে অনেক, চোখের নিচে পড়েছে কালি, বয়সের ছাপ পড়েছে ভাজ পড়া চামড়ার ভেতরে । সেই চোখ, মুখ, নাক, পাতলা ঠোঁটের একপাশের কালো তিলটাও: সবকিছু আগের মতোই আছে, একটুও বদলায় নি। চুলগুলোও ঠিক আগের মতো আছে, শুধু কপালের সামনের কয়েকগাছি চুলে পাক ধরেছে। প্রথমেই তাকালুম চোখের দিকে: দৃষ্টিতে সেদিনের আগুন ঝরা শূন্যতা আর নেই। সেদিনের দৃষ্টির আড়ালের শূন্যতায় অপেক্ষা ছিলো, হয়তো অপেক্ষার আড়লে তিল তিল করে জমিয়ে রাখা আশাও ছিলো। আজ এত বছর পর সেই চোখের দিকে হঠাৎ তাকিয়ে দেখলুম- সেখানে শূন্যতা আছে ঠিকই, কিন্তু সেই শূন্যতায় আর আগুন ঝরছে না। সেই শূন্যতা কেমন যেন নিস্তব্ধ, নিঃস্পৃহ, নিরব। নেই অপেক্ষা, আশা আর হতাশাও। আজ কত বছর পর দেখা, জানিনে। একসময় না দেখার হিসেবগুলো গুনে গুনে রাখতাম, খাতায় অংক কষার মতো। হিসেব রাখতে রাখতে কখন যে ক্লান্তি ভর করল, বিষণ্ণতা এসে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিলো, বুঝতেই পারলুম না। সেই থেকে হিসেব রাখাটা ভুলেছি বহুবছর। আজকের দিনটা বড় মেঘলা, সকাল থেকে ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে ক্লান্তিহীনভাবে। অদূরে লাগানো আমার হাতের রক্তজবা গাছে ফুল ফুটেছে; বৃষ্টির ফোঁটায় কেঁপে কেঁপে ওঠছে তার পাপড়ি। সকালে স্টেশনে ট্রেন আসার কথা ছিলো, সেটা লেট করেছে। সকালের ট্রেন আসবে দুপুরে। আমার কোনো কাজ ছিলো না। বৃষ্টির বাতসের ঝাপটায় ওড়ে আসা গাছের কাঁচা পাতা ছড়িয়ে রয়েছে প্লাটফর্মের যত্রতত্র। ভাবলুম, পাতাগুলো কুড়িয়ে প্লাটফর্মটা পরিষ্কার করে দেই। পাতা কুড়িয়ে প্রায় পরিষ্কার করে ফেলেছি, অমন সময় চোখ পড়ল প্লাটফর্মের এককোণায়। দেখলুম কে যে বসে আছে সাদা আঁচলে ঘোমটা মাথায় । পাশে একটা টিনের বাক্স। শাড়ির আঁচলে মুখটা এমনভাবে ডেকে রেখেছে দেখা যাচ্চেনা। কাছে গিয়ে বললুম, -আপনি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন নাকি? ও শাড়ির আঁচল সড়িয়ে মুখ তুলে তাকালো আমার দিকে। প্রথম দেখাতেই চিনতে পারল নাকি জানিনে। অনেক্ষণ পর ধীরে ধীরে ওঠে দাঁড়াল, মৃদুভাবে কাঁপা গলায় বললে, রুপম…! বললুম, হ্যাঁ । কতক্ষণ যে বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে থাকলুম বলতে পারিনা। ও-ই আমাকে প্রশ্ন করল, বললে,- চিনতে পেরছ? ম্লান হেসে বললুম, হ্যাঁ। “কে?” -অঙ্কিতা ! ০২. শ্রাবণের ঘোমুট বাধা অন্ধকারে ঝড়ো বাতাসে একটুকরো ছেঁড়া চিঠির অংশ ওড়ে এসে পড়লে আমার পায়ের কাছে। তখনো কি জানতাম তার দেখা পাওয়া সম্ভব হবে? হায়, আজ কি অবেলায় তার দেখা পেলুম ! আমি জানতাম, কোনো একদিন তার দেখা পাবো; কোনো একদিন : যখন সূর্যটা অস্ত যাবে, ওপারের আকাশে অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে, নিমজ্জিত আঁধারে নিজের প্রতিচ্ছবিও যখন দ্যাখতে পাবোনা, তখনো হয়ত তার দেখা পাবো ! আমি জানতাম তার দেখা পাবো! কিন্তু, হায়, এমনভাবে তাকে দেখতে পাবো সেটা কি কখনো কল্পনা করেছিলুম? আমি তাকে কল্পনা করেছিলুম বাসন্তি রঙের শাড়িতে, চোখের নিচে লেপ্টে যাওয়া গাঢ় কাজলে, পাতলা ঠোঁটের কোণায় ফুটে ওঠা এক চিলতে হাসিতে ! হায় নিয়তি, আমি কি তাকে কখনো কল্পনা করেছিলুম, সাদা শাড়িতে? বেদনায় লেপ্টে যাওয়া চোখের নিচের গাঢ় কাজলের লেখাতে? শুকিয়ে যাওয়া মৃত ঠোঁটের এক চিলতে শুষ্ক হাসিতে? কক্ষনো না। কিন্তু নিয়তি হয়ত এভাবেই আমাদের দেখা মিলিয়ে রেখেছিলো। জিজ্ঞেস করলুম, এখানে কি করে আসলে? স্মিতহাস্য মুখে অদূরে চেয়ে বললে, কাজের স্বার্থে কত জায়গা যেতে হয়, এখান আর সেখান বলতে কোনো কথা নেই। “কি কাজ?” “মেয়েদেরকে স্বাবলম্বী করে তুলার কাজ । তাদের কে নিজের পথ চিনিয়ে দেবার কাজ, নিজের আপন স্বত্বাকে ভুলে মেয়েরা নিজেকে খাঁচায় বন্দি পাখির মত করে রেখেচে , তাদের সেই আপন স্বত্বা কে জাগিয়ে তুলার কাজ।” চুপ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলুম অনেকক্ষণ। বুঝলুম নারী মুক্তির আন্দোলনে সে যোগ দিয়েছে। খানিক পর বললুম-“কবে থেকে এই কাজে আসলে?” “সুজিত চলে যাবার পর।” খানিক থেমে কিছুক্ষণ পর আপন মনেই বলতে থাকলে, সে অনেক বছর হলো। বিয়ের দুবছর পর আমি যখন পাঁচ মাসের অন্তঃস্বত্বা : রোড এক্সিডেন্টে সুজিত মারা পড়লে। শ্বশুর বাড়ির লোক ছিলো পুরোনো ধ্যান ধারণার, অপবাদ দিয়ে বল্লে, অপয়া, রাক্ষুসী। আরো কত কি উপাধি যে নামের সংঙ্গে যুক্ত করলে সেইসবের কথা এখন আর অত মনে পড়ে না। তুমি ভাবছো রাগ করে বুঝি তখন আমি চলে আসলুম। আরে না, ঠিক চলে আসলুম না, বিদেয় করে দিলো। তখন থেকে কি একটা যেনো আমার ভেতরে গজিয়ে ওঠছিলো ধীরে ধীরে, ঠিক বুঝে ওঠতে পারছিলুম না। সেই কি একটা যে আমার ভেতরের আলাদা একটা অংশ: এতদিন চাপা পড়েছিলে আবর্জনায় নিচে, এখন সুযোগ পেতেই অঙ্কুর গজানো শুরু করেছে সেটা বুঝতে আমার ঢের সময় লেগেছিলো। মেয়ে জন্ম নেওয়ার অনেক পড়ে বুঝলুম আমি আর আমি নেই। ঈশ্বর আমাকে নতুন জীবন দেখিয়ে দিলেন, আমিও সেই নতুন জীবনটাই বেচে নিলুম। এই পর্যন্ত বলে চুপ হতে রইল। বুঝলুম, জীবন সংগ্রামে হারতে হারতে জয়ী হয়ে ওঠেছে । নিজের ভেতরে গজিয়ে ওঠা স্বত্বাটা ভেঙে ফেলেছে নিয়ম বাধা সব শেকল। ছুঁড়ে ফেলেছে মুখোশের উপরের আবরণ। শুধু নিজের ভেতরের শেকলটা ভেঙে ফেলে, আবরণটা টেনে ওঠিয়েই ক্রান্ত হয়নি। এখন ভেঙে ফেলতে চাইছে সমাজের পায়ে বাধা শেকল, মুখোশটা ছিড়ে ফেলে দেখিয়ে দিতে চাইছে আসল চেহারা। বললুম, মেয়েও কি তোমার সাথে থাকে? “হ্যাঁ এতদিন সাথেই ছিলো, এখন থাকে না। এলাহাবাদে ওর বিয়ে দিয়েছি বছর তিনেক আগে ।” ০৩. আমার কথা জানতে চাইল। আমি এখানে কিভাবে স্টেশনমাস্টার হলাম? এই ভূতুড়ে জায়গায় কি করছি? এখান থেকে টার্ন্সপার হয়ে অন্যকোথাও চলে যাচ্চিনা কেন? সংক্ষেপে সব প্রশ্নের উত্তর করলাম। কিছুক্ষণ বৃষ্টি থেমে ছিলো, এখন আবার মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ট্রেন আসতে বেশি সময় নেই। হাতে যখন আর মিনিট দশেক সময় আছে, ওকে বসিয়ে রেখে ছুটে গেলাম বাইরে, রক্তজবা গাছটার কাছে। ফুল এসেছে অনেক, ফুলের ভারে গাছটার একটা চিকন ডাল নুয়ে পড়েছে মাটিতে। অনেকগুলো ফুল নিলাম। ভেজা শরীলে ওর হাতে যখন ফুল তুলে দিলাম ও বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইলে আমার দিকে। বললুম, তুমি রক্তজবা পছন্দ কর ভুলিনি। স্টেশনের ওধারটায় কয়েকটা গাছ লাগিয়ে ছিলুম অনেক আগে। প্রতি বর্ষাতে অনেক ফুল আসে, তেমনিভাবে ঝড়ে ঝড়ে পড়ে মাটিতে। কুড়িয়ে পর্যন্ত নেবার কেউ নেই। আমি মাঝে মধ্যে গিয়ে শুধু দ্যাখতুম, কখনো ঝড়ে পড়া ফুল কুড়িয়ে তুলতুম, কিন্তু ফিরে আসবার সময় ওভাবেই আবার ফেলে আসতাম । ফুলেরা হয়তো জানতো এই অসময়ে দেখা হয়ে যাবে ! ও আমার দিকে গাঢ় বিষাদভরা চোখে খানিক তাকিয়ে রইলে, ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে শুষ্ক হাসির আভাস ফুটিয়ে তুলে বললে, রঙিন কাঁপড় ছেড়েছি সে অনেক বছর হলো; যদি নিজেকে রঙিন করার অভিলাষ মনে পুষে রাখতুম তাহলে জীবনের গাছে রক্তজবা ফুটতো তারও বহু আগে। ০৪. এই নির্জন স্টেশনে ট্রেন আসে, তবে যাত্রী হয়না সবসময়। হঠাৎ হাঠাৎ দু-একজনের দেখা পাওয়া যায়। ট্রেন থামে, ট্রেনে যাত্রী ওঠে, হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন আবার চলে যায়। আবার কখনো যাত্রীশুন্য স্টেশনে ট্রেন আসে, পতাকা নাড়াই, কিন্তু সেদিন আর কেউ ওঠেনা, ট্রেন রীতিমতো গন্তব্যে ছুটে চলে। কিছুক্ষণের জন্য ট্রেনের হুইসেলে গমগম হয়ে ওঠে সারা স্টেশন, ট্রেন চলে গেলে আবার নির্জনতায় ডুবে যায় চারিপাশ। নিস্তব্ধ নিরবতায় খাঁ খাঁ করে দিগন্ত। অঙ্কিতা দাঁড়িয়ে আছে প্লাটফর্মে। পরনে সাদা শাড়ি, হাতে লাল টুকটুকে রক্তজবা। দৃষ্টি দূরের মেঘলা আকাশে নিবদ্ধ। মুষুলধারায় বৃষ্টি পড়ছে, বৃষ্টির শব্দে শুনে ভাবলুম, আকাশটা ফেটে বুঝি চৌচির হয়ে গেছে। বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়েছে দূরের ট্রেনের হুইসেল। বৃষ্টিতে স্নান করে ধীর শরীলে ট্রেন যখন একেবেঁকে এসে ডুকেছে পাল্টফর্মে ; ও দূরের আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে আমার দিকে ফিরে বললে, -তোমার ছেলে মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করলুম নাতো? তোমার ছেলে মেয়ে কয়টা? “নেই। ” ও কেমন বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইলে। ট্রেনের হাতল ধরে উঠতে যাবে এমনসময় অবিশ্বাসের স্বরে ফের জিজ্ঞেস করলে, -“সত্যি কোনো ছেলে মেয়ে নেই?” মাথা নাড়িয়ে বললুম, – না, নেই। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে, ও বসেছে জানলার পাশে। বাইরে থেকে তার হাতের অংশ দেখা যাচ্ছে। ট্রেনের গতি যখন বেড়ে চলেছে, ও জানলা দিয়ে মাথা বের করে তাকালো। বৃষ্টিতে ভেজে যাচ্ছে তার চুল, সেইদিকে খেয়াল নেই। ট্রেন ছুটে চলছে দ্রুত। হয়তো ওর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখের জল, বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে যাচ্ছে বহুদিনের জমানো ধূলোবালি। আমি তা অনুভব করলেও দ্যাখতে পাচ্ছিনা । কখন যে বৃষ্টি থেমে গেলো, ট্রেনের হুইসেল থেমে গিয়ে কবে যে দূরে মিলিয়ে গেলো ঠিক বুঝে ওঠতে পারলুম না। বিহ্বলতা কাটিয়ে ওঠতেই দেখি, এক অসহ্য নিরবতা, নিঃসঙ্গতা, নিস্তব্ধতা যেন দিগন্তবিস্তৃত নির্জনতা জুড়ে খাঁ খাঁ করছে। অদূরে লাগানো রক্তজবা গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখলুম, তখনো পাপড়ি থেকে জল ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে পড়ছে মাটিতে।
জানুয়ারি ১৫, ২০২০ 0
প্রাক্তন লেখা মোঃআসাদ রহমান কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ রাশেদ ড্রাইভার করিমকে বলল, গাড়ি সাইডে রাখো। ড্রাইভার গাড়ি সাইড করতেই নেমে গেল রাশেদ। তারপর বলল, তুমি অফিসে চলে যাও। করিমের মনে একটা প্রশ্ন এলো, স্যার, মিটিংয়ে যাবেন না? কিন্তু প্রশ্ন করল না। সে জানে রাশেদ স্যার তার এসব প্রশ্নের জবাব দিবে না বরং মিষ্টি করে একটা হাসি দিবে। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে চোখের আড়াল হতেই রাস্তার পাশে দোকান থেকে সিগারেট ধরিয়ে টানতে শুরু করল রাশেদ। সে তাকিয়ে আছে রাস্তার ওপাশে একটা সাইনবোর্ডের দিকে। সেখানে সুন্দর করে লেখা ‘ডা. মারজিয়া মৌরী, এমবিবিএস, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। রোগী দেখার সময় সোম থেকে বুধ, বিকাল চারটা থেকে রাত নয়টা’। এই নামটা দেখেই গাড়ি থেকে নেমেছিল রাশেদ। এই নামের সাথে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এখনো এই নাম কোথাও লেখা দেখলে বুকের মধ্যে মৃদু একটা ব্যথা অনুভূত হয়। রাশেদ আধখাওয়া সিগারেট ফেলে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপাশে চলে গেল। রিসিপশনে গিয়ে সানগ্লাসটা খুলতে খুলতে বলল, ডা. মারজিয়া আছেন? রিসিপশনের ছেলেটা বলল, জ্বি স্যার, আছেন। আপনি কি ভিজিট করতে এসেছেন? -হ্যাঁ। -তাহলে ওখানে বসুন স্যার। আপনার সিরিয়াল এলে আপনাকে বলব। স্টিলের বেঞ্চের উপর বসে বাম পায়ের উপর ডান পা রেখে পা নাচাতে থাকল রাশেদ। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে বসে আছে সে। এখনো তার ডাক আসেনি। রাশেদের ঠোঁটের কোণে হাসি। তার মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ লোকের এতো সময় থাকে না যে ডাক্তারের সিরিয়াল নিয়ে বসে থাকবে। সে সাধারণত তার পিএসকে দিয়ে সিরিয়াল রাখে। রাশেদ সেখানে গিয়েই ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে যায়। আর সে যেসব ডাক্তারদের দেখায়, তারা রাশেদকে ততটা গুরুত্বই দেয়। আর এখানে সে বসেবসে পা নাচাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর রাশেদের ডাক এলো। রাশেদ উঠে গিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে গেল। এয়ার কন্ডিশনড রুম। একজন দরজা খুলে দিল। রাশেদ দরজার কাছ থেকেই জিজ্ঞেস করল, ভিতরে আসব? রোগীরা সাধারণত এই ভদ্রতাটুকু দেখায় না। তারা থাকে রোগে শোকে কাতর। ভদ্রতা দেখানোর সময় নেই। ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকেই বলে, ডাক্তার, আমার কী হয়েছে, তাড়াতাড়ি বলেন। রাশেদের প্রশ্ন শুনে ডা. মারজিয়া মৌরী না তাকিয়ে বলল, আসুন। টেবিলের কাছাকাছি আসতেই বলল, বসুন। রাশেদ বসল না। সে তাকিয়ে আছে মৌরীর দিকে। আগের থেকে সামান্য মোটা হয়েছে। গায়ের রঙ কিছুটা উজ্জ্বল হয়েছে। আর চোখে উঠেছে মোটা ফ্রেমের চশমা। মৌরী বলল, কী ব্যাপার দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ব….. কথাটা শেষ করার আগে তাকালো রাশেদের দিকে। মাথায় কাঁচাপাকা চুল। পুরুষ্টু গোঁফ, মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। কিন্তু চেহারাটা আগের মতো না থাকলেও চিনতে কষ্ট হয়নি। আচ্ছা, ওর কণ্ঠটা কি আগের মতোই আছে? বসতে বসতে রাশেদ জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো মৌরী? মৌরী উত্তর দিল না। আগের মতোই মোটা কণ্ঠ। কী সুন্দর স্পষ্ট উচ্চারণ! মৌরী চোখমুখ থেকে বিস্ময় ভাব দূর করে বলল, ভালো। পরক্ষণেই সে বলল, কী সমস্যা আপনার বলুন। বলেই প্রেসক্রিপশনের প্যাড আর কলম নিয়ে রেডি হল ওষুধ লেখার জন্য। রাশেদ হেসে বলল, রাখো তো ওসব। -দেখুন, আপনার সাথে বসে গল্প করার সময় নেই আমার। বাইরে আরও পেশেন্ট বসে আছে। তাদের দেখতে হবে। -সাধারণত মেডিসিন স্পেশালিস্টের কাছে ইমার্জেন্সি পেশেন্ট আসে না। আজকের জন্য নাহয় এই পেশেন্টটাকেই দেখ। -আপনার ন্যাকামি বন্ধ করুন এবং আপনি চলে যান। -প্রায় বিশ বছর পরে দেখা। কিছু কথা না বলে কিভাবে যায়? -আপনি কি যাবেন নাকি আমি দারোয়ান ডেকে বের করে দিব? -বাংলা সিনেমা বেশি বেশি দেখছ নাকি? যাও, ডেকে নিয়ে এসো। তোমার দারোয়ান দেখুক যে তোমার বিশ বছর পুরনো প্রাক্তন প্রেমিক তোমার চেম্বারে বসে আছে। বলেই পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালো রাশেদ। মৌরী দ্রুত গতিতে বের হয়ে গেল চেম্বার থেকে। তার ডাক্তারি পেশার এই দীর্ঘ সময়ে এতটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েনি কখনো। প্রায় দুই মিনিট পর ফিরে এলো সে। ড্রয়ার থেকে একটা সুদর্শন এশট্রে বের করে দিয়ে বলল, এটাতে ছাই ফেলুন। বলেই মৌরী ওয়াশরুমে ঢুকল। ট্যাপ ছাড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সিগারেট টানতে থাকল রাশেদ। ঠোঁটের কোণে অস্ফুট হাসি। মুখে পানি দিয়েছে মৌরী। মুখ মুছতে মুছতে বলল সে, এতদিন পর কী মনে করে? -মনে তো করি সবসময়। কিন্তু খুঁজে পাইনি কখনো। -আপনি কি এখনো হেঁয়ালি করে কথা বলেন? -না। শুধু তোমার সাথে বলছি। তাই হেঁয়ালিপনাটা পরিপক্ক হচ্ছে না। -তাহলে দয়া করে হেঁয়ালি করা বন্ধ করুন। -বন্ধ করছি। তার আগে দয়া করে তুমি ‘আপনি আপনি’ করে কথা বলাটা বন্ধ কর। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মৌরী। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়ল সে। ইজিচেয়ারটায় দোল খেতে খেতে তাকিয়ে আছে রাশেদের দিকে। চুলদাড়ি পাকা হলেও চেহারার মধ্যে আগের সেই কোমলতা আছে। আগে ঠোঁট ছিল লাল আর এখন হয়েছে কালো। সিগারেটটা কি খুব বেশি খায়? সিগারেট শেষ করে রাশেদ বলল, ভাবতেই পারিনি তোমাকে সত্যিই আবার পেয়ে যাব। -খুঁজেছ কখনো? -হয়তো পাগল প্রেমিকের মতো তোমার বাড়ির সামনে বা কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকিনি। কিন্তু তোমার পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের তো জ্বালিয়েছি তোমার কথা জিজ্ঞেস করে। -তাতে আমার ক্ষতিই হয়েছে। যে বা যারা আমাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু বলার সাহস পেতো না, তারাও আমার দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলেছে শুধুমাত্র তোমার জন্য। তুমি আমার মায়ের কাছেও ফোন করেছিলে। উল্টাপাল্টা কথা বলেছিলে। -উল্টাপাল্টা বলিনি। তিনি যা জিজ্ঞেস করেছেন তার উত্তর দিয়েছিলাম। -তার উত্তর ভদ্রভাবেও দেওয়া যায়। -মেকি ভদ্রতা দেখানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর তোমাকে হারানোর পর আমি প্রায় পাগল হয়ে গেছিলাম। -কিন্তু তোমার পাগলামিতে একটা মেয়ের ক্ষতি হতে পারে, সেটা কি ভাবোনি? -আমি তোমার কোন ক্ষতি করিনি। -যাক, ও তর্কে যেতে চাই না। চা খাবে? -হুম। খাওয়া যেতে পারে। তোমার পেশেন্টরা কোথায়? -বিদায় করে দিয়েছি। কারণ তুমি আগে যেমন পাগল ছিলে, এখনো সেরকমই আছ। রাশেদ হাসল। বেল টিপে পিয়নকে ডেকে বলল, দুইটা চিনি ছাড়া চা দাও। রাশেদ চোখ বড় করে তাকাল মৌরীর দিকে। জিজ্ঞেস করল, তুমি চিনি ছাড়া চা খাওয়া ধরলে কবে? -তোমার সাথে রিলেশন থাকাকালীন সময়ে মাঝেমধ্যে খেতাম তা তো জানই। -হ্যাঁ। তুমি কত সুন্দর করেই না বলতে ‘এই জঘন্য জিনিস তুমি খাও কী করে?’ -আর সেই জঘন্য জিনিসটা আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। তুমি কি সিগারেট খাওয়া ছাড়তে চেষ্টা করনি? -নাহ। তুমি থাকতে আমাকে বুঝিয়ে বলতে। একটা কথা বলেছিলে মনে আছে? -কী কথা? -একবার বললাম যে সিগারেট ছেড়ে দিব। তখন তুমি বললে, ‘তুমি যদি আমার জন্য সিগারেট ছাড়তে পারো, তাহলে আমি তোমার জন্য সিগারেটের দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারব না কেন? একটা প্রশ্ন মনে পড়ল। তুমি এশট্রে রাখো কেন? -তোমার জন্য। উত্তর শুনে হা করে আছে রাশেদ। প্রশ্ন করল মৌরী, বিশ্বাস করলে না? -বিশ্বাস করা বা না করার চেয়ে অবাক হচ্ছি বেশি। তুমি জানতে যে আমি কোনদিন আসব? -জানতাম না। আমার বিশ্বাস ছিল, কোন একদিন তোমার সাথে দেখা হবে। তোমাকে অনুভব করার জন্য একটা পাগলামি করতাম। -কী পাগলামি? -মাঝেমধ্যে সিগারেট ধরিয়ে এশট্রেতে রাখতাম। মনে করতাম তুমি আমার সামনে বসে সিগারেট টানছ। রাশেদ কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগে পিয়ন চা নিয়ে উপস্থিত। চায়ের কাপে একসাথে চুমুক দিল দুজনেই। সাথেসাথে দুজনে হেসে উঠল। হাসার পিছনের কারণটা বেশ রোমাঞ্চকর। রাশেদ আর মৌরীর যখন সম্পর্ক ছিল, তখন দুজনে রাত জেগে ফোনে কথা বলত। হঠাৎ দুজনে একসাথে চুপ হয়ে যাওয়া, একসাথে কথা বলে ওঠা একসাথে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিংবা একসাথে চুমু খাওয়া- ব্যাপারগুলো দুএকবার হলে তাকে কাকতালীয় বলে চালিয়ে দেওয়া যেত কিন্তু হামেশাই এরকম হতো। তখন রাশেদ এবং মৌরী দুজনেই একসাথে অবাক এবং আনন্দিত হতো। আজ সেরকম একটা ঘটনা ঘটল। দুজনে একসাথে চায়ের কাপে শব্দ করে চুমুক দিল। হাসি থামিয়ে রাশেদ বলল, সেই আগের মতো। খুব নমনীয় গলায় মৌরী বলল, কী? -তোমার হাসি, তোমার অভিমান, তোমার গলার স্বর, তোমার চোখ। সবকিছু; সবকিছু ঠিক আগের মতো। -আগের মতো নেই। অনেককিছু পাল্টে গেছে। এখন হয়তো রাত জেগে ফোনে কথা হয় না। কারও দীর্ঘশ্বাস শুনি না বা কারও মোটা স্বরে গল্প বা কবিতা শুনি না। কিংবা তুমিও হয়তো কারও কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে পাও না। -আমি এখনো তোমার গান শুনি। রাত হলেই বেলকনিতে বসে তোমার কথা ভাবি। চোখ বন্ধ করে তোমার গলায় শুনি ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কীইবা মৃদু বায়’ রাশেদের কাছ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে মৌরী গুণগুণ করে গানের একাংশ গাইতে শুরু করল, পিক কিবা কুঞ্জে কুঞ্জে কুহু কুহু কুহু গায়, কী জানি কিসেরও লাগি প্রাণ করে হায়-হায়। তখন রাশেদ বলল, সেই স্বর, সেই সুর। তুমি জানো মৌরী? আমি এখনো তোমার স্পর্শ অনুভব করি। একটা দিন, মাত্র একটা দিন তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তুমি আমার হাত ধরেছিলে। তোমার কোমল হাতের স্পর্শ আমি কখনো ভুলতে পারিনি। সেই অনুভূতি আমি এখনো পাই। কিভাবে পাই তা জানি না। কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয় তুমি আমাকে ছুঁয়ে যাও। তোমার কি এমন হয় না? একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মৌরী। হয়তো হয়, হয়তো না। তুমি আমার জীবন থেকে যে সময়টা চলে গেছিলে….. -ভুল বললে। আমি যাইনি, তুমি গিয়েছিলে। -আঘাতটা তো তুমিই দিয়েছিলে। যাইহোক, ওই সময়ে ওই আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না। আমি পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা, ডাক্তারি হওয়াটা বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থায় ছিল। -তার জন্য সরি বলে ক্ষমা আশা করছি না। আমি জানি, আমার একটা ভুল তোমার জীবনে অনেক বড় ক্ষতি করেছে। আর শুধুমাত্র একটা শব্দ ‘সরি’ সেই ভুলের মাশুল হতে পারে না। ওই ভুলের জন্য অনেক বড় মূল্য দিতে হয়। -বাদ দাও ওসব। বর্তমানের কথা বল। বিয়ে করেছ? শব্দ করে হাসল রাশেদ। কোনরকম হাসি থামিয়ে বলল, তোমার কী ধারণা আমি দেবদাসের মতো বিয়েশাদি না করে পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াব? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে তোমার চলে যাওয়ার পর অনেক পাগলামি করেছিলাম। শেষপর্যন্ত আশা রেখেছিলাম যে তোমার সাথে একবার হলেও যোগাযোগ করতে পারব কিন্তু যখন তোমার সাথে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ হয়ে গেল, তখন আর উপায় ছিল না। এদিকে তখন বাড়ি থেকেও বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল। সবকিছু মিলিয়ে দেখলাম যে, তোমাকে আর পাওয়া হবে না। তাই বিয়েশাদি করে পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে গেলাম। -কিন্তু তোমাকে দেখে আগের মতো সেই বোহেমিয়ান মনে হচ্ছে, সংসারী মনে হচ্ছে না। চুলটুল তো পাকিয়ে ফেলেছ। চুলে কালি কর না কেন? -তুমি তো জান, আমি যা নই তা দেখানোতে আমার তৎপরতা নেই। চুল পেকেছে, থাকুক পাকা চুল। -অবশ্য দেখতে ভালই লাগছে। চাকরিবাকরি কর কিছু? -করতাম একটা। বারো বছর পর ছেড়ে দিয়েছি। এখন ব্যবসাবাণিজ্য করছি। পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে মৌরীকে দিল রাশেদ। কার্ডটা নিয়ে মৌরী দেখল তাতে লেখা ‘মৌরী গ্রুপ অফ কোম্পানি’। কার্ডের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে মৌরী। তারপর জিজ্ঞেস করল, আমার নামে তোমার কোম্পানি? রাশেদ হেসে বলল, না। আমার মেয়েটার নামে। আর তার নাম রেখেছিলাম তোমার নামে। -তোমার বউ এ ব্যাপারে কিছু বলে না? -প্রথম প্রথম খোঁচাতো। কিন্তু এখন আর বলে না। -সে কী করে? -সংসার করে। পুরোদস্তুর সংসারী মেয়ে সে। -আমার চেয়েও ভালো? প্রশ্নটায় এক প্রকার অনুযোগ ছিল। রাশেদ তা বুঝতে পেরে বলল, দেখ, তোমাকে তো প্রেমিকা হিসেবে পেয়েছিলাম কিন্তু তাকে পাইনি। আবার তাকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছি, তোমাকে পাইনি। তাই তুলনাটা করা যাচ্ছে না। তবে বললে বিশ্বাস করবে? -কী? জীবনে অনেক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে, হয়তো অনেক মেয়ের সাথে সম্পর্কেও জড়িয়েছি। কিন্তু তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে পারিনি। আর তুমি শুধু আমাকে ভালই বাসোনি, তুমি আমাকে শিখিয়েছ কিভাবে ভালবাসতে হয়। আর সেই ভালবাসাটা আমি কাউকে দিতে পারিনি মৌরী। রাশেদের গলা ধরে এসেছে। টেবিলের উপর রাখা প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাতে চেষ্টা করছে সে, কিন্তু পারছে না। তার হাত কাঁপছে। মৌরী এসে রাশেদের সামনে টেবিলে বসে লাইটারটা নিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিল। সিগারেটে ঘনঘন টান দিচ্ছে রাশেদ। মৌরী রাশেদের ডান হাতটা তার দুহাতের মধ্যে নিয়ে নিল। কেউ কোন কথা বলছে না। কিন্তু দুজনের নীরবতাও অনেক কথার ঊর্ধ্বে। মৌরী আর রাশেদ চেম্বার থেকে বের হয়েছে। চেম্বারের বাইরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। রাশেদ বলল, তোমার হাজবেন্ড কী করে? প্রশ্নটা শুনে মৌরী অপ্রস্তুত হয়ে গেল। আমতাআমতা করে বলল, তুমি কিভাবে বুঝলে যে আমি বিয়ে করেছি? -না বোঝার কোন কারণ নেই। আর তোমার মোবাইলের স্ক্রিনে তোমার আর তোমার হাজবেন্ডের ছবি। -ওহ। ও ইঞ্জিনিয়ার। -বাহ। স্বামী ইঞ্জিনিয়ার, স্ত্রী ডাক্তার। তো, সুখেই আছো, না? বাচ্চাকাচ্চা? -একটা ছেলে। চার বছর বয়স। তখনি মৌরীর গাড়ি চলে এলো। সে জিজ্ঞেস করল রাশেদকে, তুমি কোথায় যাবে? -আমার অফিসে যাব। মিরপুরে। -তোমার গাড়ি নেই? -গাড়ি ছেড়ে দিয়েছি। সমস্যা নেই, আমি ক্যাব নিয়ে চলে যাব। -চল, তোমাকে সামনে ড্রপ করে দেই। -না, থাকুক। সারাজীবন একসাথে চলার ইচ্ছা ছিল। এখন এতটুকু পথ নাহয় নাই গেলাম। -রাখ তো তোমার নাটকীয় কথাবার্তা। গাড়িতে ওঠ। -তোমার এই ভদ্রতার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি গাড়িতে উঠব না। যাও, আর হ্যাঁ, ভালো থেকো। মৌরী গাড়িতে উঠে বসল। রাশেদ নির্লিপ্তভাবে হেঁটে চলছে। মৌরী ধারণা করেছিল রাশেদ একবার ফিরে তাকাবে কিন্তু রাশেদ তাকায়নি। সে তাকালে মৌরী দেখতে পেতো রাশেদের চোখদুটো ভেজা। বেশ কয়েকদিন পরের কথা। রাশেদের অফিসের কর্ম ব্যস্ততায় সময় চলে যায়। তার মধ্যেও প্রায়ই একটু সময় বের করে। সোম থেকে বুধ- এই তিনটা দিন সময় বের করে মৌরীর চেম্বারে যায়। রিসিপশনের ছেলেটা আড়চোখে দুএকবার তাকায় রাশেদের দিকে। আজ রোগীর ভিড় কম। রাশেদ বসে আছে ওয়েটিং রুমে। সে বেশ আগে এলেও তার সিরিয়াল আসছে না অর্থাৎ তাকে ডাকা হচ্ছে না। সে বাদে বাকি সবার ডাক পড়ছে। সব রোগী দেখা শেষ হলে মৌরী বেরিয়ে এল। রাশেদকে বলল, তুমি গাড়ি এনেছ? -হ্যাঁ। -চল। -কোথায়? -আমি যেখানে বলি। ড্রাইভিং সিটে রাশেদ, পাশের সিটে মৌরী। ঢাকা শহরের যানজট পার করে তারা চলে এসেছে কেরানীগঞ্জ পার হয়ে আরও সামনে। অনেক প্রশস্ত রাস্তার পাশে ছোটছোট ক্যাফেটেরিয়া। রাস্তার দুপাশে কাশবন। এখনো কাশফুল ফোটেনি। সবুজের সাগর মনে হচ্ছে। এই সবুজের মধ্যে মৌরীর মুখে জমে আছে কালো মেঘ। রাশেদ পকেট থেকে প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরাল। একটা ক্যাফেটেরিয়ার সামনে দুজনে বসেছে। মৌরী সময় নিচ্ছে কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। রাশেদ বুঝতে পারছে কোন কারণে মৌরী তার উপর রাগ বা বিরক্ত। কিন্তু কারণটা সে বুঝতে পারছে না। ওয়েটার দুই মগ কফি দিয়ে গেছে। ধোঁয়া উড়ছে সেখান থেকে। কফির ঘ্রাণটাও নাকে আসছে, বেশ মিষ্টি ঘ্রাণ। সিগারেট শেষ হতে মৌরী বলল, আরেকটা সিগারেট ধরাও। সিগারেটের ধোঁয়া একটা আড়াল তৈরি করবে। তোমার সাথে যে কথাগুলো বলব তা আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারব না৷ আবার অন্যদিকে তাকিয়েও বলতে পারব না। তোমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে। রাশেদ ফের সিগারেট ধরাল। মৌরী কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারেনি। বাকি কথাগুলো যদি এলোমেলো করে বলে তাহলে সমস্যা হতে পারে। তবুও সে শুরু করল, দেখ রাশেদ, তোমার সম্পর্কটা শেষ হয়েছে একুশ বছর আগে। তার আগে মাত্র একটা বছর সম্পর্ক ছিল এবং সেই এক বছরে মাত্র একটা দিনের একটা ঘণ্টা আমরা একসাথে ছিলাম। তাও যে নির্জন স্থানে বা বদ্ধ রুমে ছিলাম তা কিন্তু না। ভিড়ের মধ্যে দুজনে হাত ধরে হেঁটেছিলাম। সেই অনুভূতি, সেই স্মৃতি আমি বেশকিছু দিন বয়ে বেড়ালেও সময় এবং পরিস্থিতি আমাকে তা ভুলতে সাহায্য করেছে। এই একুশ বছরে প্রথম দিকে দু-চারবার মনে পড়লেও আমি তোমাকে সেরকম মনে করিনি বা তোমার কথা খুব একটা মনে পড়েনি। তোমাকে ভুলে আমার লাভই হয়েছে। আমার ডাক্তারি পড়া শেষ হয়েছে, আমি ডাক্তার হয়েছি, আমার ফ্যামিলির দায়িত্ব নিয়েছি, বিয়ে করে সংসার করছি। আমি কিন্তু খারাপ নেই। কিন্তু…. একটু দম নেওয়ার জন্য থামল মৌরী। রাশেদ নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৌরীর ঠোঁটের দিকে। কত সুন্দর করেই না সে কথা বলছে। দম নিয়ে মৌরী বলল, কিন্তু তুমি এতদিন পরে সামনে এসে আমার সুন্দর গোছানো জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছ। আমি তো এমনটা চাইনি। তুমি যেদিন প্রথম এসেছিলে, তখন প্রথমেই তোমার সাথে যেরকম আচরণটা করেছিলাম, ওইটা ধরে রাখলে এতকিছু হতো না৷ তোমার সাথে একটু ভালো করে কথা বললাম, আর তুমি সুযোগটা নিয়ে নিলে। অবশ্য আমারও পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাশেদ, তোমার সংসার আছে, স্ত্রী আছে, সন্তান আছে। আমারও স্বামী-সন্তান, সুন্দর একটা সংসার হয়েছে। কেন আমরা এগুলোকে নষ্ট করছি? চুপ করে থেকো না, কথা বল। রাশেদ নমনীয় গলায় বলল, বলতে থাকো। আবারও দম নিয়ে বলা শুরু করল মৌরী, তুমি যা করছ তা একটা টিনেজার ছেলেকে মানায়, একটা মধ্যবয়সী আধবুড়োকে মানায় না। আর তুমি তো ব্যক্তিত্বহীন নও, আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম তোমার ব্যক্তিত্বকে, তোমার ইগোকে। সেই তুমি ব্যক্তিত্বহীনের মতো আমার পিছু নাও। আমার গাড়ি ফলো করে আমার বাসা পর্যন্ত গিয়েছ। একদিন দুইদিন হলে একটা কথা ছিল। কিন্তু তুমি প্রায় প্রতিটা দিনই এই কাজ করছ। লোকে এসব দেখে, রাশেদ। আর তারা এসব ভাল চোখে দেখে না। আর আমার হাজবেন্ড সেও এটা লক্ষ্য করেছে এবং তার কাছে এই খবরটা গেছে যে তার স্ত্রীর অনেক পুরনো বন্ধু বা হয়তো প্রেমিক তার সাথে দেখা করতে চেম্বারে আসে। সেও যথেষ্ট ব্যক্তিত্ববান বলে আমাকে সরাসরি এই কথাগুলো বলেনি কিন্তু তার আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি দেখে এটুকু বুঝতে পেরেছি যে ব্যাপারটা তার ভালো লাগছে না। সে আমাকে অনেক ভালবাসে এবং আমার খেয়াল রাখে। আমি চাই না, তার সেই ভালবাসাটা কমে যাক। আর আমাদের মধ্যে একটু দূরত্ব তৈরি হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের ছেলেটা। আর একজন মা হয়ে সন্তানের এমন ক্ষতি চাইব না। তাই তোমার কাছে অনুরোধ, তুমি প্লিজ আমার কাছে এসো না, আমাকে ফলো কর না। তোমারও তো স্ত্রী আছে, একটা মেয়ে আছে। তাদের কথা ভাবো, তুমি তো তোমার স্ত্রীকে ঠকাচ্ছ, তাই নয় কী? -হয়তো। -হয়তো আবার কী? তোমার স্ত্রীর কথা বাদ দিলাম, তোমার মেয়েটার কথা তো ভাবো। যদি তুমি এরকম উল্টাপাল্টা কর, তাহলে তোমার সংসারে সমস্যা হবে, আর তার ফলটা ভোগ করবে তোমার নিষ্পাপ মেয়েটা। তুমি নিশ্চয় তা চাও না, এই বুড়ো বয়সে কেলেঙ্কারি হোক। থামল মৌরী। শুধুমাত্র বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। রাস্তা দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে দু’একটা গাড়ি ছুটে চলছে। মৌরী দেখল রাশেদ যে দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরিয়েছিল ওটা হাতেই শেষ হয়েছে। ছাইটা এখনো পড়ে যায়নি তবে যেকোনো মুহূর্তে পড়ে যাবে। মৌরী বলল, একটা কথা বল তো, তুমি এখনো আমাকে আমাকে ভালবাসো? রাশেদ বলল, হ্যাঁ। কিন্তু তার গলার স্বরটা পাল্টে গেছে। কেমনযেন ধরে আসছে গলাটা। মৌরী বলল, কতটুকু ভালবাসো? আগের মতো? -হ্যাঁ। -যাকে ভালবাসো, তার ক্ষতি চাও তুমি? -না। -যাকে তুমি ভালবাসো, তার কথাটা শুনবে না? -হুম। -তাহলে প্লিজ, এসব বাদ দাও। কী হবে রাশেদ? এসব করে কী হবে? আমার জীবনে তোমার ফিরে আসার চান্স নেই, এবং সত্যি বলতে দরকারও নেই। আর আমি মনে করি, তোমার জীবনেও আমার দরকার নেই। প্রায় নিঃশব্দে রাশেদ বলল, দরকার আছে। কিন্তু মৌরী সেই কথাটা শুনতে পাইনি। রাশেদ বলল, দেখো মৌরী, তোমাকে আমি এক ঘণ্টার জন্য, এক দিনের জন্য বা এক বছরের জন্য ভালবাসিনি। তোমাকে ভালবেসেছি সারা জীবনের জন্য। তাই এখনো বাসি। ভবিষ্যতেও বাসব। কিন্তু তোমাকে পাবো না-এটা জানি। তবুও ভালবেসে যাব। আমার জন্য তোমার যা ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে পারব না। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে আর কখনো কোনদিন বিরক্ত করব না। একটু প্রশ্ন করি, উত্তর দিবে? মৌরী বলল, হ্যাঁ। বল। রাশেদ মৌরীর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, তুমি কি এখনো আমাকে ভালবাস না? মৌরী উত্তর দিচ্ছে না। সেও তাকিয়ে আছে রাশেদের চোখের দিকে। চোখের পাতা কাঁপছে তার। ঠোঁটদুটোতে ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। উত্তরটা দিতে পারছে না। ভাইভা বোর্ডে যখন কোন চাকরি প্রার্থী প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, তখন তার যেমন অবস্থা হয়, মৌরীরও একই অবস্থা। হঠাৎ রাশেদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মৌরী আস্তে করে বলল, নাহ। বাসি না। রাশেদ হাসছে। নিঃশব্দে হাসি। মৌরী রাশেদের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। তার ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, এখন ওঠা যাক। রাশেদ একটা গানের একটা লাইন গাইল, আরও কিছুক্ষণ কি রবে বন্ধু? আরও কিছু কথা কি হবে? গানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। রাশেদও গাড়িতে উঠে পড়ল। এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল দু’মগ কফি। রাশেদ গাড়িতে উঠে রেডিও ছাড়ল। কী কাকতালীয় ব্যাপার! রাশেদের সবচেয়ে প্রিয় গানটাই বাজছে, O light the candle, John The daylight has almost gone The birds have sung their last The bells call all to mass. সারাটা পথ দুজনের কেউ কোন কথা বলল না। এমনকি মৌরী গাড়ি থেকে নামার সময় মৌরী বা রাশেদ কেউই বলেনি ‘ভালো থেকো’। মাসখানেক পরের কথা। সেদিনের পর থেকে রাশেদ কখনো মৌরীর চেম্বারে আসেনি। বরং রাশেদ না আসাতে মৌরীর খারাপ লেগেছে। তবে ধীরেধীরে সে রাশেদের ব্যাপারটা মাথা থেকে বাদ দিতে সক্ষম হয়েছে। ঠিক তখনি এক রোগী এলো মৌরীর কাছে। রোগীকে দেখা শেষ হওয়ার পর সাধারণত উঠে চলে যায়। কিন্তু এই রোগী চলে না গিয়ে বসে রইল। তারপর বলল, আমি সম্ভবত আপনাকে চিনি। মৌরী অবাক হয়ে বলল, চেনেন মানে? আমাকে আগে কোথাও দেখেছেন? যেহেতু ডাক্তারি করি, হাসপাতালে চাকরি করি, দেখে থাকতে পারেন। -না। হাসপাতালে না। আপনাকে দেখেছি একজনের অতীতে। তার গল্পে, তার স্মৃতিতে। সেখানে আপনি ডাক্তার না, একজন প্রেমিকা। -কী বলতে চাচ্ছেন? -আমি যদি ভুল না করি, আপনি মৌরী। রাশেদ নামে কাউকে চেনেন বা চিনতেন? মৌরী যা এতদিন ধরে ভোলার চেষ্টা করছে, এই লোকটা তা মনে করিয়ে দিচ্ছে৷ মৌরী বলল, হ্যাঁ। চিনি। -রাশেদ আপনার কথা এতই বলে যে মাঝেমধ্যে রাগ হত, বিরক্ত হয়ে যেতাম। এক পর্যায়ে ভাবলাম, যদি কোনদিন মৌরীর দেখা পায় একটা কথা বলব। -কী কথা? -আপনি একটা কোহিনূর হীরা হারিয়েছেন। কেউ যে একটা মেয়েকে বিশ-একুশ বছর ধরে কিভাবে ভালবেসে যায়। যার জন্য বিয়েটা পর্যন্ত করেনি। অনেক টাকাপয়সা পয়সা জমিয়েছে। কিন্তু ওসব কে খাবে? ওকে কত বোঝালাম যে, বিয়েটা করে সংসারী হ। কিন্তু কে শোনে কার কথা? করলই না। মৌরীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। সে ড্রয়ার থেকে রাশেদের দেওয়া কার্ডটা বের করতে করতে বলল, ও তো বলেছে ও বিয়ে করেছে। কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ওর মেয়ের নামে কোম্পানি দিয়েছে। লোকটা হেসে বলল, কোম্পানিটা ওর মেয়ের নামে না, আপনার নামে। আর ও মেয়ে পাবে কোথায়? বিয়েই তো করেনি। আপনার সাথে ওর দেখা হয়েছিল? -হ্যাঁ। কিছুদিন আগে হঠাৎ আমার চেম্বারে এসেছিল। বেশকিছু দিন দেখা হল। পরে ওকে বুঝিয়ে বললাম যে দেখা করাটা আমার জন্য ক্ষতিকর হয়ে যাচ্ছে। তখন ও বলেছিল যে বিয়ে করেছে। একটা মেয়ে আছে। আমার নামেই মেয়েটার নাম রেখেছে। -আপনাকে মিথ্যা বলেছে সে। আমি গত দুই মাস ব্যবসায়ের কাজে সিঙ্গাপুর গেছিলাম। ও হ্যাঁ, আমার পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি। আমি সুলতান মাহমুদ। মৌরী আবার চমকালো। ওদের সম্পর্কের সময় রাশেদের মুখে একটা ছেলের নাম বেশি শুনত। আর সে হচ্ছে ‘সুলতান মাহমুদ’। মৌরী বলল, আপনার কথা ওর মুখে অনেক শুনতাম। -আর আমরা এখন একসাথে ব্যবসা করি। যাইহোক, ভালো লাগল আপনাকে দেখে। ভালো থাকবেন। আমার একটা মিটিংয়ে জয়েন করা লাগবে। তাই উঠছি। সুলতান মাহমুদ চলে গেল। মৌরী জানালার দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চুপ হয়ে। এতটাও ভালবাসা যায়? সিনেমায় দেখেছে এরকম। আর তাকেই কেউ সেই সিনেমার নায়কের মতো ভালবাসে? কিছুক্ষণ পর রাশেদের ডাক এলো। রাশেদ উঠে গিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে গেল। এয়ার কন্ডিশনড রুম। একজন দরজা খুলে দিল। রাশেদ দরজার কাছ থেকেই জিজ্ঞেস করল, ভিতরে আসব? রোগীরা সাধারণত এই ভদ্রতাটুকু দেখায় না। তারা থাকে রোগে শোকে কাতর। ভদ্রতা দেখানোর সময় নেই। ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকেই বলে, ডাক্তার, আমার কী হয়েছে, তাড়াতাড়ি বলেন। রাশেদের প্রশ্ন শুনে ডা. মারজিয়া মৌরী না তাকিয়ে বলল, আসুন। টেবিলের কাছাকাছি আসতেই বলল, বসুন। রাশেদ বসল না। সে তাকিয়ে আছে মৌরীর দিকে। আগের থেকে সামান্য মোটা হয়েছে। গায়ের রঙ কিছুটা উজ্জ্বল হয়েছে। আর চোখে উঠেছে মোটা ফ্রেমের চশমা। মৌরী বলল, কী ব্যাপার দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ব….. কথাটা শেষ করার আগে তাকালো রাশেদের দিকে। মাথায় কাঁচাপাকা চুল। পুরুষ্টু গোঁফ, মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। কিন্তু চেহারাটা আগের মতো না থাকলেও চিনতে কষ্ট হয়নি। আচ্ছা, ওর কণ্ঠটা কি আগের মতোই আছে? বসতে বসতে রাশেদ জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো মৌরী? মৌরী উত্তর দিল না। আগের মতোই মোটা কণ্ঠ। কী সুন্দর স্পষ্ট উচ্চারণ! মৌরী চোখমুখ থেকে বিস্ময় ভাব দূর করে বলল, ভালো। পরক্ষণেই সে বলল, কী সমস্যা আপনার বলুন। বলেই প্রেসক্রিপশনের প্যাড আর কলম নিয়ে রেডি হল ওষুধ লেখার জন্য। রাশেদ হেসে বলল, রাখো তো ওসব। -দেখুন, আপনার সাথে বসে গল্প করার সময় নেই আমার। বাইরে আরও পেশেন্ট বসে আছে। তাদের দেখতে হবে। -সাধারণত মেডিসিন স্পেশালিস্টের কাছে ইমার্জেন্সি পেশেন্ট আসে না। আজকের জন্য নাহয় এই পেশেন্টটাকেই দেখ। -আপনার ন্যাকামি বন্ধ করুন এবং আপনি চলে যান। -প্রায় বিশ বছর পরে দেখা। কিছু কথা না বলে কিভাবে যায়? -আপনি কি যাবেন নাকি আমি দারোয়ান ডেকে বের করে দিব? -বাংলা সিনেমা বেশি বেশি দেখছ নাকি? যাও, ডেকে নিয়ে এসো। তোমার দারোয়ান দেখুক যে তোমার বিশ বছর পুরনো প্রাক্তন প্রেমিক তোমার চেম্বারে বসে আছে। বলেই পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালো রাশেদ। মৌরী দ্রুত গতিতে বের হয়ে গেল চেম্বার থেকে। তার ডাক্তারি পেশার এই দীর্ঘ সময়ে এতটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েনি কখনো। প্রায় দুই মিনিট পর ফিরে এলো সে। ড্রয়ার থেকে একটা সুদর্শন এশট্রে বের করে দিয়ে বলল, এটাতে ছাই ফেলুন। বলেই মৌরী ওয়াশরুমে ঢুকল। ট্যাপ ছাড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সিগারেট টানতে থাকল রাশেদ। ঠোঁটের কোণে অস্ফুট হাসি। মুখে পানি দিয়েছে মৌরী। মুখ মুছতে মুছতে বলল সে, এতদিন পর কী মনে করে? -মনে তো করি সবসময়। কিন্তু খুঁজে পাইনি কখনো। -আপনি কি এখনো হেঁয়ালি করে কথা বলেন? -না। শুধু তোমার সাথে বলছি। তাই হেঁয়ালিপনাটা পরিপক্ক হচ্ছে না। -তাহলে দয়া করে হেঁয়ালি করা বন্ধ করুন। -বন্ধ করছি। তার আগে দয়া করে তুমি ‘আপনি আপনি’ করে কথা বলাটা বন্ধ কর। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মৌরী। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়ল সে। ইজিচেয়ারটায় দোল খেতে খেতে তাকিয়ে আছে রাশেদের দিকে। চুলদাড়ি পাকা হলেও চেহারার মধ্যে আগের সেই কোমলতা আছে। আগে ঠোঁট ছিল লাল আর এখন হয়েছে কালো। সিগারেটটা কি খুব বেশি খায়? সিগারেট শেষ করে রাশেদ বলল, ভাবতেই পারিনি তোমাকে সত্যিই আবার পেয়ে যাব। -খুঁজেছ কখনো? -হয়তো পাগল প্রেমিকের মতো তোমার বাড়ির সামনে বা কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকিনি। কিন্তু তোমার পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের তো জ্বালিয়েছি তোমার কথা জিজ্ঞেস করে। -তাতে আমার ক্ষতিই হয়েছে। যে বা যারা আমাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু বলার সাহস পেতো না, তারাও আমার দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলেছে শুধুমাত্র তোমার জন্য। তুমি আমার মায়ের কাছেও ফোন করেছিলে। উল্টাপাল্টা কথা বলেছিলে। -উল্টাপাল্টা বলিনি। তিনি যা জিজ্ঞেস করেছেন তার উত্তর দিয়েছিলাম। -তার উত্তর ভদ্রভাবেও দেওয়া যায়। -মেকি ভদ্রতা দেখানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর তোমাকে হারানোর পর আমি প্রায় পাগল হয়ে গেছিলাম। -কিন্তু তোমার পাগলামিতে একটা মেয়ের ক্ষতি হতে পারে, সেটা কি ভাবোনি? -আমি তোমার কোন ক্ষতি করিনি। -যাক, ও তর্কে যেতে চাই না। চা খাবে? -হুম। খাওয়া যেতে পারে। তোমার পেশেন্টরা কোথায়? -বিদায় করে দিয়েছি। কারণ তুমি আগে যেমন পাগল ছিলে, এখনো সেরকমই আছ। রাশেদ হাসল। বেল টিপে পিয়নকে ডেকে বলল, দুইটা চিনি ছাড়া চা দাও। রাশেদ চোখ বড় করে তাকাল মৌরীর দিকে। জিজ্ঞেস করল, তুমি চিনি ছাড়া চা খাওয়া ধরলে কবে? -তোমার সাথে রিলেশন থাকাকালীন সময়ে মাঝেমধ্যে খেতাম তা তো জানই। -হ্যাঁ। তুমি কত সুন্দর করেই না বলতে ‘এই জঘন্য জিনিস তুমি খাও কী করে?’ -আর সেই জঘন্য জিনিসটা আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। তুমি কি সিগারেট খাওয়া ছাড়তে চেষ্টা করনি? -নাহ। তুমি থাকতে আমাকে বুঝিয়ে বলতে। একটা কথা বলেছিলে মনে আছে? -কী কথা? -একবার বললাম যে সিগারেট ছেড়ে দিব। তখন তুমি বললে, ‘তুমি যদি আমার জন্য সিগারেট ছাড়তে পারো, তাহলে আমি তোমার জন্য সিগারেটের দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারব না কেন? একটা প্রশ্ন মনে পড়ল। তুমি এশট্রে রাখো কেন? -তোমার জন্য। উত্তর শুনে হা করে আছে রাশেদ। প্রশ্ন করল মৌরী, বিশ্বাস করলে না? -বিশ্বাস করা বা না করার চেয়ে অবাক হচ্ছি বেশি। তুমি জানতে যে আমি কোনদিন আসব? -জানতাম না। আমার বিশ্বাস ছিল, কোন একদিন তোমার সাথে দেখা হবে। তোমাকে অনুভব করার জন্য একটা পাগলামি করতাম। -কী পাগলামি? -মাঝেমধ্যে সিগারেট ধরিয়ে এশট্রেতে রাখতাম। মনে করতাম তুমি আমার সামনে বসে সিগারেট টানছ। রাশেদ কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগে পিয়ন চা নিয়ে উপস্থিত। চায়ের কাপে একসাথে চুমুক দিল দুজনেই। সাথেসাথে দুজনে হেসে উঠল। হাসার পিছনের কারণটা বেশ রোমাঞ্চকর। রাশেদ আর মৌরীর যখন সম্পর্ক ছিল, তখন দুজনে রাত জেগে ফোনে কথা বলত। হঠাৎ দুজনে একসাথে চুপ হয়ে যাওয়া, একসাথে কথা বলে ওঠা একসাথে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিংবা একসাথে চুমু খাওয়া- ব্যাপারগুলো দুএকবার হলে তাকে কাকতালীয় বলে চালিয়ে দেওয়া যেত কিন্তু হামেশাই এরকম হতো। তখন রাশেদ এবং মৌরী দুজনেই একসাথে অবাক এবং আনন্দিত হতো। আজ সেরকম একটা ঘটনা ঘটল। দুজনে একসাথে চায়ের কাপে শব্দ করে চুমুক দিল। হাসি থামিয়ে রাশেদ বলল, সেই আগের মতো। খুব নমনীয় গলায় মৌরী বলল, কী? -তোমার হাসি, তোমার অভিমান, তোমার গলার স্বর, তোমার চোখ। সবকিছু; সবকিছু ঠিক আগের মতো। -আগের মতো নেই। অনেককিছু পাল্টে গেছে। এখন হয়তো রাত জেগে ফোনে কথা হয় না। কারও দীর্ঘশ্বাস শুনি না বা কারও মোটা স্বরে গল্প বা কবিতা শুনি না। কিংবা তুমিও হয়তো কারও কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে পাও না। -আমি এখনো তোমার গান শুনি। রাত হলেই বেলকনিতে বসে তোমার কথা ভাবি। চোখ বন্ধ করে তোমার গলায় শুনি ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বহে কীইবা মৃদু বায়’ রাশেদের কাছ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে মৌরী গুণগুণ করে গানের একাংশ গাইতে শুরু করল, পিক কিবা কুঞ্জে কুঞ্জে কুহু কুহু কুহু গায়, কী জানি কিসেরও লাগি প্রাণ করে হায়-হায়। তখন রাশেদ বলল, সেই স্বর, সেই সুর। তুমি জানো মৌরী? আমি এখনো তোমার স্পর্শ অনুভব করি। একটা দিন, মাত্র একটা দিন তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তুমি আমার হাত ধরেছিলে। তোমার কোমল হাতের স্পর্শ আমি কখনো ভুলতে পারিনি। সেই অনুভূতি আমি এখনো পাই। কিভাবে পাই তা জানি না। কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয় তুমি আমাকে ছুঁয়ে যাও। তোমার কি এমন হয় না? একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মৌরী। হয়তো হয়, হয়তো না। তুমি আমার জীবন থেকে যে সময়টা চলে গেছিলে….. -ভুল বললে। আমি যাইনি, তুমি গিয়েছিলে। -আঘাতটা তো তুমিই দিয়েছিলে। যাইহোক, ওই সময়ে ওই আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা ছিল না। আমি পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা, ডাক্তারি হওয়াটা বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থায় ছিল। -তার জন্য সরি বলে ক্ষমা আশা করছি না। আমি জানি, আমার একটা ভুল তোমার জীবনে অনেক বড় ক্ষতি করেছে। আর শুধুমাত্র একটা শব্দ ‘সরি’ সেই ভুলের মাশুল হতে পারে না। ওই ভুলের জন্য অনেক বড় মূল্য দিতে হয়। -বাদ দাও ওসব। বর্তমানের কথা বল। বিয়ে করেছ? শব্দ করে হাসল রাশেদ। কোনরকম হাসি থামিয়ে বলল, তোমার কী ধারণা আমি দেবদাসের মতো বিয়েশাদি না করে পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াব? হ্যাঁ, এটা ঠিক যে তোমার চলে যাওয়ার পর অনেক পাগলামি করেছিলাম। শেষপর্যন্ত আশা রেখেছিলাম যে তোমার সাথে একবার হলেও যোগাযোগ করতে পারব কিন্তু যখন তোমার সাথে যোগাযোগের সব পথ বন্ধ হয়ে গেল, তখন আর উপায় ছিল না। এদিকে তখন বাড়ি থেকেও বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল। সবকিছু মিলিয়ে দেখলাম যে, তোমাকে আর পাওয়া হবে না। তাই বিয়েশাদি করে পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে গেলাম। -কিন্তু তোমাকে দেখে আগের মতো সেই বোহেমিয়ান মনে হচ্ছে, সংসারী মনে হচ্ছে না। চুলটুল তো পাকিয়ে ফেলেছ। চুলে কালি কর না কেন? -তুমি তো জান, আমি যা নই তা দেখানোতে আমার তৎপরতা নেই। চুল পেকেছে, থাকুক পাকা চুল। -অবশ্য দেখতে ভালই লাগছে। চাকরিবাকরি কর কিছু? -করতাম একটা। বারো বছর পর ছেড়ে দিয়েছি। এখন ব্যবসাবাণিজ্য করছি। পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে মৌরীকে দিল রাশেদ। কার্ডটা নিয়ে মৌরী দেখল তাতে লেখা ‘মৌরী গ্রুপ অফ কোম্পানি’। কার্ডের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে মৌরী। তারপর জিজ্ঞেস করল, আমার নামে তোমার কোম্পানি? রাশেদ হেসে বলল, না। আমার মেয়েটার নামে। আর তার নাম রেখেছিলাম তোমার নামে। -তোমার বউ এ ব্যাপারে কিছু বলে না? -প্রথম প্রথম খোঁচাতো। কিন্তু এখন আর বলে না। -সে কী করে? -সংসার করে। পুরোদস্তুর সংসারী মেয়ে সে। -আমার চেয়েও ভালো? প্রশ্নটায় এক প্রকার অনুযোগ ছিল। রাশেদ তা বুঝতে পেরে বলল, দেখ, তোমাকে তো প্রেমিকা হিসেবে পেয়েছিলাম কিন্তু তাকে পাইনি। আবার তাকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছি, তোমাকে পাইনি। তাই তুলনাটা করা যাচ্ছে না। তবে বললে বিশ্বাস করবে? -কী? জীবনে অনেক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে, হয়তো অনেক মেয়ের সাথে সম্পর্কেও জড়িয়েছি। কিন্তু তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে পারিনি। আর তুমি শুধু আমাকে ভালই বাসোনি, তুমি আমাকে শিখিয়েছ কিভাবে ভালবাসতে হয়। আর সেই ভালবাসাটা আমি কাউকে দিতে পারিনি মৌরী। রাশেদের গলা ধরে এসেছে। টেবিলের উপর রাখা প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাতে চেষ্টা করছে সে, কিন্তু পারছে না। তার হাত কাঁপছে। মৌরী এসে রাশেদের সামনে টেবিলে বসে লাইটারটা নিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিল। সিগারেটে ঘনঘন টান দিচ্ছে রাশেদ। মৌরী রাশেদের ডান হাতটা তার দুহাতের মধ্যে নিয়ে নিল। কেউ কোন কথা বলছে না। কিন্তু দুজনের নীরবতাও অনেক কথার ঊর্ধ্বে। মৌরী আর রাশেদ চেম্বার থেকে বের হয়েছে। চেম্বারের বাইরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। রাশেদ বলল, তোমার হাজবেন্ড কী করে? প্রশ্নটা শুনে মৌরী অপ্রস্তুত হয়ে গেল। আমতাআমতা করে বলল, তুমি কিভাবে বুঝলে যে আমি বিয়ে করেছি? -না বোঝার কোন কারণ নেই। আর তোমার মোবাইলের স্ক্রিনে তোমার আর তোমার হাজবেন্ডের ছবি। -ওহ। ও ইঞ্জিনিয়ার। -বাহ। স্বামী ইঞ্জিনিয়ার, স্ত্রী ডাক্তার। তো, সুখেই আছো, না? বাচ্চাকাচ্চা? -একটা ছেলে। চার বছর বয়স। তখনি মৌরীর গাড়ি চলে এলো। সে জিজ্ঞেস করল রাশেদকে, তুমি কোথায় যাবে? -আমার অফিসে যাব। মিরপুরে। -তোমার গাড়ি নেই? -গাড়ি ছেড়ে দিয়েছি। সমস্যা নেই, আমি ক্যাব নিয়ে চলে যাব। -চল, তোমাকে সামনে ড্রপ করে দেই। -না, থাকুক। সারাজীবন একসাথে চলার ইচ্ছা ছিল। এখন এতটুকু পথ নাহয় নাই গেলাম। -রাখ তো তোমার নাটকীয় কথাবার্তা। গাড়িতে ওঠ। -তোমার এই ভদ্রতার জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু আমি গাড়িতে উঠব না। যাও, আর হ্যাঁ, ভালো থেকো। মৌরী গাড়িতে উঠে বসল। রাশেদ নির্লিপ্তভাবে হেঁটে চলছে। মৌরী ধারণা করেছিল রাশেদ একবার ফিরে তাকাবে কিন্তু রাশেদ তাকায়নি। সে তাকালে মৌরী দেখতে পেতো রাশেদের চোখদুটো ভেজা। বেশ কয়েকদিন পরের কথা। রাশেদের অফিসের কর্ম ব্যস্ততায় সময় চলে যায়। তার মধ্যেও প্রায়ই একটু সময় বের করে। সোম থেকে বুধ- এই তিনটা দিন সময় বের করে মৌরীর চেম্বারে যায়। রিসিপশনের ছেলেটা আড়চোখে দুএকবার তাকায় রাশেদের দিকে। আজ রোগীর ভিড় কম। রাশেদ বসে আছে ওয়েটিং রুমে। সে বেশ আগে এলেও তার সিরিয়াল আসছে না অর্থাৎ তাকে ডাকা হচ্ছে না। সে বাদে বাকি সবার ডাক পড়ছে। সব রোগী দেখা শেষ হলে মৌরী বেরিয়ে এল। রাশেদকে বলল, তুমি গাড়ি এনেছ? -হ্যাঁ। -চল। -কোথায়? -আমি যেখানে বলি। ড্রাইভিং সিটে রাশেদ, পাশের সিটে মৌরী। ঢাকা শহরের যানজট পার করে তারা চলে এসেছে কেরানীগঞ্জ পার হয়ে আরও সামনে। অনেক প্রশস্ত রাস্তার পাশে ছোটছোট ক্যাফেটেরিয়া। রাস্তার দুপাশে কাশবন। এখনো কাশফুল ফোটেনি। সবুজের সাগর মনে হচ্ছে। এই সবুজের মধ্যে মৌরীর মুখে জমে আছে কালো মেঘ। রাশেদ পকেট থেকে প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরাল। একটা ক্যাফেটেরিয়ার সামনে দুজনে বসেছে। মৌরী সময় নিচ্ছে কথাগুলো গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। রাশেদ বুঝতে পারছে কোন কারণে মৌরী তার উপর রাগ বা বিরক্ত। কিন্তু কারণটা সে বুঝতে পারছে না। ওয়েটার দুই মগ কফি দিয়ে গেছে। ধোঁয়া উড়ছে সেখান থেকে। কফির ঘ্রাণটাও নাকে আসছে, বেশ মিষ্টি ঘ্রাণ। সিগারেট শেষ হতে মৌরী বলল, আরেকটা সিগারেট ধরাও। সিগারেটের ধোঁয়া একটা আড়াল তৈরি করবে। তোমার সাথে যে কথাগুলো বলব তা আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারব না৷ আবার অন্যদিকে তাকিয়েও বলতে পারব না। তোমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে। রাশেদ ফের সিগারেট ধরাল। মৌরী কথাগুলো গুছিয়ে বলতে পারেনি। বাকি কথাগুলো যদি এলোমেলো করে বলে তাহলে সমস্যা হতে পারে। তবুও সে শুরু করল, দেখ রাশেদ, তোমার সম্পর্কটা শেষ হয়েছে একুশ বছর আগে। তার আগে মাত্র একটা বছর সম্পর্ক ছিল এবং সেই এক বছরে মাত্র একটা দিনের একটা ঘণ্টা আমরা একসাথে ছিলাম। তাও যে নির্জন স্থানে বা বদ্ধ রুমে ছিলাম তা কিন্তু না। ভিড়ের মধ্যে দুজনে হাত ধরে হেঁটেছিলাম। সেই অনুভূতি, সেই স্মৃতি আমি বেশকিছু দিন বয়ে বেড়ালেও সময় এবং পরিস্থিতি আমাকে তা ভুলতে সাহায্য করেছে। এই একুশ বছরে প্রথম দিকে দু-চারবার মনে পড়লেও আমি তোমাকে সেরকম মনে করিনি বা তোমার কথা খুব একটা মনে পড়েনি। তোমাকে ভুলে আমার লাভই হয়েছে। আমার ডাক্তারি পড়া শেষ হয়েছে, আমি ডাক্তার হয়েছি, আমার ফ্যামিলির দায়িত্ব নিয়েছি, বিয়ে করে সংসার করছি। আমি কিন্তু খারাপ নেই। কিন্তু…. একটু দম নেওয়ার জন্য থামল মৌরী। রাশেদ নিথর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৌরীর ঠোঁটের দিকে। কত সুন্দর করেই না সে কথা বলছে। দম নিয়ে মৌরী বলল, কিন্তু তুমি এতদিন পরে সামনে এসে আমার সুন্দর গোছানো জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছ। আমি তো এমনটা চাইনি। তুমি যেদিন প্রথম এসেছিলে, তখন প্রথমেই তোমার সাথে যেরকম আচরণটা করেছিলাম, ওইটা ধরে রাখলে এতকিছু হতো না৷ তোমার সাথে একটু ভালো করে কথা বললাম, আর তুমি সুযোগটা নিয়ে নিলে। অবশ্য আমারও পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাশেদ, তোমার সংসার আছে, স্ত্রী আছে, সন্তান আছে। আমারও স্বামী-সন্তান, সুন্দর একটা সংসার হয়েছে। কেন আমরা এগুলোকে নষ্ট করছি? চুপ করে থেকো না, কথা বল। রাশেদ নমনীয় গলায় বলল, বলতে থাকো। আবারও দম নিয়ে বলা শুরু করল মৌরী, তুমি যা করছ তা একটা টিনেজার ছেলেকে মানায়, একটা মধ্যবয়সী আধবুড়োকে মানায় না। আর তুমি তো ব্যক্তিত্বহীন নও, আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম তোমার ব্যক্তিত্বকে, তোমার ইগোকে। সেই তুমি ব্যক্তিত্বহীনের মতো আমার পিছু নাও। আমার গাড়ি ফলো করে আমার বাসা পর্যন্ত গিয়েছ। একদিন দুইদিন হলে একটা কথা ছিল। কিন্তু তুমি প্রায় প্রতিটা দিনই এই কাজ করছ। লোকে এসব দেখে, রাশেদ। আর তারা এসব ভাল চোখে দেখে না। আর আমার হাজবেন্ড সেও এটা লক্ষ্য করেছে এবং তার কাছে এই খবরটা গেছে যে তার স্ত্রীর অনেক পুরনো বন্ধু বা হয়তো প্রেমিক তার সাথে দেখা করতে চেম্বারে আসে। সেও যথেষ্ট ব্যক্তিত্ববান বলে আমাকে সরাসরি এই কথাগুলো বলেনি কিন্তু তার আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি দেখে এটুকু বুঝতে পেরেছি যে ব্যাপারটা তার ভালো লাগছে না। সে আমাকে অনেক ভালবাসে এবং আমার খেয়াল রাখে। আমি চাই না, তার সেই ভালবাসাটা কমে যাক। আর আমাদের মধ্যে একটু দূরত্ব তৈরি হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের ছেলেটা। আর একজন মা হয়ে সন্তানের এমন ক্ষতি চাইব না। তাই তোমার কাছে অনুরোধ, তুমি প্লিজ আমার কাছে এসো না, আমাকে ফলো কর না। তোমারও তো স্ত্রী আছে, একটা মেয়ে আছে। তাদের কথা ভাবো, তুমি তো তোমার স্ত্রীকে ঠকাচ্ছ, তাই নয় কী? -হয়তো। -হয়তো আবার কী? তোমার স্ত্রীর কথা বাদ দিলাম, তোমার মেয়েটার কথা তো ভাবো। যদি তুমি এরকম উল্টাপাল্টা কর, তাহলে তোমার সংসারে সমস্যা হবে, আর তার ফলটা ভোগ করবে তোমার নিষ্পাপ মেয়েটা। তুমি নিশ্চয় তা চাও না, এই বুড়ো বয়সে কেলেঙ্কারি হোক। থামল মৌরী। শুধুমাত্র বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। রাস্তা দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে দু’একটা গাড়ি ছুটে চলছে। মৌরী দেখল রাশেদ যে দ্বিতীয় সিগারেটটা ধরিয়েছিল ওটা হাতেই শেষ হয়েছে। ছাইটা এখনো পড়ে যায়নি তবে যেকোনো মুহূর্তে পড়ে যাবে। মৌরী বলল, একটা কথা বল তো, তুমি এখনো আমাকে আমাকে ভালবাসো? রাশেদ বলল, হ্যাঁ। কিন্তু তার গলার স্বরটা পাল্টে গেছে। কেমনযেন ধরে আসছে গলাটা। মৌরী বলল, কতটুকু ভালবাসো? আগের মতো? -হ্যাঁ। -যাকে ভালবাসো, তার ক্ষতি চাও তুমি? -না। -যাকে তুমি ভালবাসো, তার কথাটা শুনবে না? -হুম। -তাহলে প্লিজ, এসব বাদ দাও। কী হবে রাশেদ? এসব করে কী হবে? আমার জীবনে তোমার ফিরে আসার চান্স নেই, এবং সত্যি বলতে দরকারও নেই। আর আমি মনে করি, তোমার জীবনেও আমার দরকার নেই। প্রায় নিঃশব্দে রাশেদ বলল, দরকার আছে। কিন্তু মৌরী সেই কথাটা শুনতে পাইনি। রাশেদ বলল, দেখো মৌরী, তোমাকে আমি এক ঘণ্টার জন্য, এক দিনের জন্য বা এক বছরের জন্য ভালবাসিনি। তোমাকে ভালবেসেছি সারা জীবনের জন্য। তাই এখনো বাসি। ভবিষ্যতেও বাসব। কিন্তু তোমাকে পাবো না-এটা জানি। তবুও ভালবেসে যাব। আমার জন্য তোমার যা ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে পারব না। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, তোমাকে আর কখনো কোনদিন বিরক্ত করব না। একটু প্রশ্ন করি, উত্তর দিবে? মৌরী বলল, হ্যাঁ। বল। রাশেদ মৌরীর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, তুমি কি এখনো আমাকে ভালবাস না? মৌরী উত্তর দিচ্ছে না। সেও তাকিয়ে আছে রাশেদের চোখের দিকে। চোখের পাতা কাঁপছে তার। ঠোঁটদুটোতে ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। উত্তরটা দিতে পারছে না। ভাইভা বোর্ডে যখন কোন চাকরি প্রার্থী প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না, তখন তার যেমন অবস্থা হয়, মৌরীরও একই অবস্থা। হঠাৎ রাশেদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মৌরী আস্তে করে বলল, নাহ। বাসি না। রাশেদ হাসছে। নিঃশব্দে হাসি। মৌরী রাশেদের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না। তার ব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, এখন ওঠা যাক। রাশেদ একটা গানের একটা লাইন গাইল, আরও কিছুক্ষণ কি রবে বন্ধু? আরও কিছু কথা কি হবে? গানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। রাশেদও গাড়িতে উঠে পড়ল। এই ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল দু’মগ কফি। রাশেদ গাড়িতে উঠে রেডিও ছাড়ল। কী কাকতালীয় ব্যাপার! রাশেদের সবচেয়ে প্রিয় গানটাই বাজছে, O light the candle, John The daylight has almost gone The birds have sung their last The bells call all to mass. সারাটা পথ দুজনের কেউ কোন কথা বলল না। এমনকি মৌরী গাড়ি থেকে নামার সময় মৌরী বা রাশেদ কেউই বলেনি ‘ভালো থেকো’। মাসখানেক পরের কথা। সেদিনের পর থেকে রাশেদ কখনো মৌরীর চেম্বারে আসেনি। বরং রাশেদ না আসাতে মৌরীর খারাপ লেগেছে। তবে ধীরেধীরে সে রাশেদের ব্যাপারটা মাথা থেকে বাদ দিতে সক্ষম হয়েছে। ঠিক তখনি এক রোগী এলো মৌরীর কাছে। রোগীকে দেখা শেষ হওয়ার পর সাধারণত উঠে চলে যায়। কিন্তু এই রোগী চলে না গিয়ে বসে রইল। তারপর বলল, আমি সম্ভবত আপনাকে চিনি। মৌরী অবাক হয়ে বলল, চেনেন মানে? আমাকে আগে কোথাও দেখেছেন? যেহেতু ডাক্তারি করি, হাসপাতালে চাকরি করি, দেখে থাকতে পারেন। -না। হাসপাতালে না। আপনাকে দেখেছি একজনের অতীতে। তার গল্পে, তার স্মৃতিতে। সেখানে আপনি ডাক্তার না, একজন প্রেমিকা। -কী বলতে চাচ্ছেন? -আমি যদি ভুল না করি, আপনি মৌরী। রাশেদ নামে কাউকে চেনেন বা চিনতেন? মৌরী যা এতদিন ধরে ভোলার চেষ্টা করছে, এই লোকটা তা মনে করিয়ে দিচ্ছে৷ মৌরী বলল, হ্যাঁ। চিনি। -রাশেদ আপনার কথা এতই বলে যে মাঝেমধ্যে রাগ হত, বিরক্ত হয়ে যেতাম। এক পর্যায়ে ভাবলাম, যদি কোনদিন মৌরীর দেখা পায় একটা কথা বলব। -কী কথা? -আপনি একটা কোহিনূর হীরা হারিয়েছেন। কেউ যে একটা মেয়েকে বিশ-একুশ বছর ধরে কিভাবে ভালবেসে যায়। যার জন্য বিয়েটা পর্যন্ত করেনি। অনেক টাকাপয়সা পয়সা জমিয়েছে। কিন্তু ওসব কে খাবে? ওকে কত বোঝালাম যে, বিয়েটা করে সংসারী হ। কিন্তু কে শোনে কার কথা? করলই না। মৌরীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। সে ড্রয়ার থেকে রাশেদের দেওয়া কার্ডটা বের করতে করতে বলল, ও তো বলেছে ও বিয়ে করেছে। কার্ডটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ওর মেয়ের নামে কোম্পানি দিয়েছে। লোকটা হেসে বলল, কোম্পানিটা ওর মেয়ের নামে না, আপনার নামে। আর ও মেয়ে পাবে কোথায়? বিয়েই তো করেনি। আপনার সাথে ওর দেখা হয়েছিল? -হ্যাঁ। কিছুদিন আগে হঠাৎ আমার চেম্বারে এসেছিল। বেশকিছু দিন দেখা হল। পরে ওকে বুঝিয়ে বললাম যে দেখা করাটা আমার জন্য ক্ষতিকর হয়ে যাচ্ছে। তখন ও বলেছিল যে বিয়ে করেছে। একটা মেয়ে আছে। আমার নামেই মেয়েটার নাম রেখেছে। -আপনাকে মিথ্যা বলেছে সে। আমি গত দুই মাস ব্যবসায়ের কাজে সিঙ্গাপুর গেছিলাম। ও হ্যাঁ, আমার পরিচয়টাই তো দেওয়া হয়নি। আমি সুলতান মাহমুদ। মৌরী আবার চমকালো। ওদের সম্পর্কের সময় রাশেদের মুখে একটা ছেলের নাম বেশি শুনত। আর সে হচ্ছে ‘সুলতান মাহমুদ’। মৌরী বলল, আপনার কথা ওর মুখে অনেক শুনতাম। -আর আমরা এখন একসাথে ব্যবসা করি। যাইহোক, ভালো লাগল আপনাকে দেখে। ভালো থাকবেন। আমার একটা মিটিংয়ে জয়েন করা লাগবে। তাই উঠছি। সুলতান মাহমুদ চলে গেল। মৌরী জানালার দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চুপ হয়ে। এতটাও ভালবাসা যায়? সিনেমায় দেখেছে এরকম। আর তাকেই কেউ সেই সিনেমার নায়কের মতো ভালবাসে?

হলো না পাওয়া তোকে

জানুয়ারি ১৫, ২০২০ 0
হলো না পাওয়া তোকে
উফফ, অসহ্য, সন্ধ্যায় এতটা বাজে পরিস্থিতিতে পরবে, কখনো ভাবেও নি মাহমুদা, হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো, রাস্তা থেকে একপ্রকার দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ই পাশের একটা টং এর দোকানে গিয়ে দাঁড়ালো সে, ইতিমধ্যে সেখানে আরো লোকজন জড়ো হয়েছে বৃষ্টি থেকে একটু বাঁচার আশায়। . কয়েকটা ছেলে এসে মাহমুদার ভিজা শরীরের দিকে তাকিয়ে মজা নিচ্ছে। . মাহমুদা তার হাজব্যান্ড কে ফোন দিচ্ছে বারবার।ধরছে না কেটে দিচ্ছে। একরাশ বিরক্তি মুখে নিয়ে মনে মনেই সে উচ্চারণ করল স্টুপিড, কেয়ারলেস। . খিট খিটে মেজাজ ঠান্ডা করার কোনো উপায় পাচ্ছে না মাহমুদা।বাজে ছেলে গুলো গায়ের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবারও সে কল দিলো তার হাজবেন্ড কে।কল ওয়েটিং!! কি করবে ভেবে পাচ্ছেনা সে।হঠাৎ মাহমুদা খেয়াল করলো এই ঝড় তুফানের মাঝেও একটা ছেলে ভবঘুরের মত ভিজে ভিজে আসছে।এটা দেখে মাহমুদার কলেজ জীবনের কথা মনে পড়ে যায়।তার ও বৃষ্টিতে ভেজার লোভ হয় খুব।কতো দিন মন খুলে বৃষ্টিতে ভেজা হয়না তার।কিন্তু এই শাড়ী – হাই হিল পরে কেউ বৃষ্টিতে ভিজলে সেটা কেমন যেনো হয়ে যাবে।ছেলেটার দিকে তাকিয়েই থাকতে থাকতেই এসব ভাবে সে।এদিকে হাঁটতে হাঁটতেই ছেলেটা খেয়াল করে একটা অপ্সরীর মত সুন্দর মেয়ে তার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে।ছেলেটা তখন আর মন খুলে ভিজতে পারেনা। মন খুলে বৃষ্টিতে ভিজতে হয় লোকচক্ষুর আড়ালে।বৃষ্টিতে ভেজার সময় কেউ হা করে তাকিয়ে থাকলে সেটা যে কত বিরক্তিকর তা যে ভেজে সেই কেবল বুঝে, ছেলেটাও ভেজা বাদ দিয়ে টং দোকানে এসে দাঁড়ায়, লজ্জায় মেয়েটার দিকে একবার ও আর তাকায় না। মাহমুদা তার কিশোরীবেলার স্মৃতি থেকে বাস্তবে ফিরে গাড়ির হর্ণ এর আওয়াজে।একজন সুটেট বুটেট লোক গাড়ির দরজা খুলে একরাশ বিরক্তি মুখে নিয়ে মাহমুদার দিকে তাকিয়ে ধমকের স্বরে বলে ভিতরে আসোহ।শাড়ি- হাই হিল পরে মাহমুদা টং দোকান থেকে বৃষ্টির ভিতর দিয়ে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে।ওঠার সময় খেয়াল করে ভবঘুরে ছেলেটা তাকিয়েই আছে তার দিকে এখনো। . সাঁই সাঁই শব্দ করে পানির বুক চিরে চলে যায় গাড়িটা।ছেলেটাও আবার বৃষ্টির মাঝে হাঁটা শুরু করে। ___________________________ মাহমুদা গাড়িতে বসে ফোন হাতে নেয়। অনেক আগের মুখস্ত করা নাম্বার,একটু কষ্ট করে মনে করে।তারপর , টপাটপ ডায়াল করে, একটা মেসেজ পাঠায়, ” আগের মতই রয়ে গেছো তাই না?? তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে গোসল করো।নাহলে ঠান্ডা লেগে যাবে।জ্বর আসবে ” ছেলেটা মেসেজের শব্দ পায়, পকেট থেকে মোবাইল বের করে,স্ক্রীনে জ্বল জ্বল করতে থাকা প্রিয় নামটা আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে আসে বৃষ্টির পানির ফোঁটায়, ৮ বছর আগেও, এভাবেই নামটা আবছা হয়ে এসেছিলো ছেলেটির চোখের পানিতে, আজ চোখে পানি আছে?? হয়ত নেই, আবার হয়ত বৃষ্টির পানির সাথে মিশে গেছে তাই বোঝা যায় না। ৮ বছর আগে,মাহমুদার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ করেনি হাসিব। বিরক্তি বোঝাই করা সংসার হলেও কোনরকম চলে যাচ্ছে মাহমুদার জীবনগাড়ি, কোন এক হঠাৎ সন্ধ্যায় আবার তাকে দেখা!! . থেমে নেই সময়।কখন যে আট টা বছর কেটে গেলো!! ভেবেই আবার ঝুম বৃষ্টিতে, রাস্তার পাশ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চোখের আড়াল হয়ে যায় ছেলেটি। লেখক : আসাদ রহমান কোটচাঁদপুর,ঝিনাইদহ

অভিশপ্ত প্রেম/Asad Rahman

জানুয়ারি ১৫, ২০২০ 0
অভিশপ্ত প্রেম/Asad Rahman
শিশির বিছানায় জীবন বিশ্বাসঘাতকতা   শহীদদের হত্যা করার জন্য মাটি লাল হয়ে গেছে,   অন্তরে অবাধ্য প্রেম জেগে ওঠে   সংক্রামিত ভ্রূণের কাছে স্বাধীনতার বীজ বপন করুন।   অভিমানী মা আজ অজ্ঞান হয়ে কাঁদছেন   স্বাধীনতার নীচে নিমজ্জন কি অপ্রয়োজনীয়?   ফাগুনের আগুনে মাটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে   অকাল মৃত্যুর নীতিমালা!   স্বপ্নের রঙ ফিকে হয়ে যায়   শাপালা দোয়েল অন্যায়ভাবে কেঁদেছিলেন,   সুশাসনের স্বাদ নেই; তারা মুগ্ধ করে তাদের গ্রাস করে   গনচিল ও ইলিশের ঝাঁক প্যাডেলে আসেনি   মহাজন অহংকার করে সুখের দলে   প্রভুকে উপেক্ষা করা, নিন্দার প্রতি অন্ধ হতে,   এই প্রথাতে এখন অনিয়ম নিয়ম   খোঁড়া জাতির দেশ আমার কাঁপতে ভয় পাচ্ছে!   মানুষ যদি মানুষকে বিশ্বাস না করে, ঘৃণা ঘৃণা বাড়ে   সুখের অভিব্যক্তিতে সত্য বোঝার দরকার নেই!   জাতি সর্বদা অশ্লীলতার অভিশাপে কেঁদেছিল   জীবনে কেউ কী করবে এবং বিপর্যয় ডুবে যাবে?

জল-শব্দ /Asad Rahman

জানুয়ারি ১৫, ২০২০ 0
জল-শব্দ /Asad Rahman
মুঠোতে ধরে রাখি শব্দঘর এপাশের টুকিটাকি বিস্ময় ভেসে যায় অন্য পাশ… জানি, শব্দেরো থাকে ঘ্রাণ! পশ্চিমের জলমরা বর্ণমালায় ফোটে ঊনপঞ্চাশী বাগানবিলাস… ধ্বনিও ডেকে তুলে ডুবন্ত অন্তঃপুর ভালবাসা নড়ে অক্ষরের আয়নায় শব্দও হয় নারী এবং পুরুষ… যন্ত্রের বুকেও জন্ম নেয় জলহাওয়া যান্ত্রিক আকাশেও ভারী মেঘ হয় অতলস্পর্শী বৃষ্টিতে ভিজে শব্দের নিঃশ্বাস। একদিন দেখা হবে! মুখোমুখি হবে কথা! ভাষার পৃথিবীতে বাক্যে হবে জলাশয় একদানা শব্দ ঠোঁটে, অপেক্ষায় একজোড়া সারস। শুধু অন্তঃস্থ আলাপে, থমথমে দূরত্ব গভীর নিয়তির জলপথে দুর্দান্ত জটিলতা সাঁতরে বেড়ায় তবু সরু স্বপ্ন হাঁটে স্রোতের চারপাশ। তবু একদানা-শব্দ ‘ভালবাসা’ আজও প্রবল থাকবে আগামীকালও!

মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২০

খুব বেশি মনে পড়ে তোমাকে ২০২০

জানুয়ারি ১৪, ২০২০ 0
S...খুব বেশি মনে পড়ে তোমাকে আমাকে কী তোমার মনে পড়ে? না না, আমাকে তো তোমার মনে পড়ার কোনো প্রশ্নই আসে না, তুমি তো আর এখন এই পৃথিবীর বুকে নেই। আমি পাগল না হলে কী আর তোমাকে এমন কথা বলতে পারি? কিন্তু তোমাকে আমার ঠিকই মনে পড়ে। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে তোমাকে আমার মনে পড়ে। মনে পড়বেই না কেন? তোমার-আমার সেই দিনের পুরনো কথাগুলো যে আমাকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রথম যেদিন তুমি আমাকে বন্ধুত্বের আহ্বান করলে সেদিন আমি কিন্তু তোমাকে পাত্তাই দেইনি। আমি একজন ছেলে হয়ে তোমার প্রথম বন্ধুত্বের আহ্বান ফিরিয়ে দিয়েছি, তবুও তুমি পর পর কয়েক দিন চেষ্টা করার পর আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি। আমি কী কোনো মহানায়ক ছিলাম যে, তোমার মতো এমন একজন সুন্দরী মেয়ে আমাকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে আহ্বান করার পরেও প্রথমে সাড়া দেয়নি। না, আমি মোটেও কোনো মহানায়ক বা সাধারণ, অসাধারণ কোনো নায়ক ছিলাম না। আমি ছিলাম সরল-সহজ একজন সাধারণ ছেলে, এখনো তাই আছি। তবে কেন তোমার মতো একটা মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব করতে আপত্তি ছিল? আসলে তোমার আগে আমার আরো কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল। তারা আমার সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্বের ভালো ব্যবহার দেখিয়ে সরল মনে দাগ দিয়েছে। আমি তাদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম। আমি জানতাম যে, জীবনে চলার জন্য মানুষের বন্ধুত্বের প্রয়োজন আছে, এও জানি যে বন্ধু ছাড়া মানুষ একা চলতে পারে না। তাই তো আমি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলাম। কিন্তু তারা কি করল জানো? আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে প্রতারণা করলো, আস্তে আস্তে কুড়ে কুড়ে আমাকে যেন শেষ করে দিচ্ছিল। কিভাবে কি করল তারা আমার সঙ্গে সে বর্ণনা নাইবা দিলাম। সে কথাগুলো বলতে গেলে কষ্ট আমার বাড়তে থাকবে। তারা আমার সঙ্গে বন্ধুত্বের নামে প্রতারণা করে চলে যাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নেই যে, আর জীবনে কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমি এসে আমাকে যেন চুম্বকের মতো টেনে নিলে। প্রথমে তো পাত্তা দিইনি। কিন্তু একের পর এক যখন তুমি আমার পিছু লেগে থাকতে শুরু করলে তখন আমার মনটাকে একটু নরম করলাম। দেখে না শেষবারের মতো তোমার সঙ্গে বন্ধুত্বটা করে। তাই তো হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম বন্ধুত্বে। হ্যাঁ, তুমি আমার শেষ বন্ধু হলেও খুব ভালো একজন বন্ধু ছিলে। তোমার সব কথা আমার সঙ্গে শেয়ার করতে। আমি আস্তে আস্তে তোমার সঙ্গে আমার দুঃখ, কষ্ট, বেদনার কথাগুলো শেয়ার করতাম। তোমার সঙ্গে মিশে বুঝতে পারলাম যে, আমার চেয়ে তোমার মনে অনেক কষ্ট। তোমার মা নেই, তোমাকে আট বছর বয়সে রেখে তোমার মা মারা যায়। তোমার বাবা আবার দ্বিতীয় বিয়ে করে। তোমার সৎ মা তোমাকে ভালোবাসতো না। অনেক কষ্ট দিত। তোমাকে দিয়ে কাজের বুয়ার চেয়েও বেশি কাজ করাত। এছাড়াও আরো নানানভাবে তোমাকে কষ্ট দিত। তাছাড়া তুমি একটা ছেলেকে ভালোবেসেছিলে তাও আমার সঙ্গে শেয়ার করেছো। ছেলেটি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তোমাকে ঠকিয়েছে। ভালোবাসার অভিনয় করে তোমার দুচোখে শুধু স্বপ্ন এঁকে দিয়ে অন্যকে নিয়ে ঘর করছে। তোমার মতো আমার বেলাতেও হয়েছে। তোমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে আমাকেও দুয়েকজনে ভালোবাসি বলে স্বপ্ন দেখিয়ে চলে গেছে। তবে আমার চেয়ে তোমার কষ্টগুলো অনেক বড় মনে হয়। যখন তোমার কষ্টের কথাগুলো শুনতাম তখন আমি আস্তে আস্তে তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে যেতে থাকি। তোমার কষ্টে আমি কষ্ট পেতে থাকি। তোমার কষ্টের ভাগিদার হতে চাই। কিন্তু তা আর হতে পারলাম না। একদিন সকালে শুনতে পেলাম যে, তুমি নাকি ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলাতে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছো। প্রথমে তো আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, তুমি আত্মহত্যা করেছো। আমি দেখতে গিয়েছিলাম তোমার লাশ। তোমার মরা মুখ দেখে আমি বলেছিলাম যে, তুমি মরনি, ঘুমিয়ে আছ। আমার কথা শোনে অনেকে পাগল বলেছে আমাকে। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে, তুমি সত্যি সত্যি ঘুমিয়েছিলে। তখন সবার সামনে একটুও কাঁদিনি। কিন্তু বাসায় আসার পর আমি গোপনে অনেক কেঁদেছি। এখনো তোমার জন্য আমার দুচোখে জল ঝরে। তোমার কবরে যখন আমি মাটি ছুঁই তখন আমার বুকের ভেতরটা যেন দাউ দাউ করে জ্বলে। এতটা কষ্ট এখনো আমি তোমার জন্য পাই। যদি বেঁচে থাকতে তাহলে তোমাকে ছাড়া আমার জীবন সাথী আর কাউকে করতাম না। আজো তোমাকে ভেবে দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। তোমাকে অনেক, অনেক মনে পড়ে। খুব মিস করি তোমায়। আমাকে কী তোমার মনে পড়ে? না না, আমাকে তো তোমার মনে পড়ার কোনো প্রশ্নই আসে না, তুমি তো আর এখন এই পৃথিবীর বুকে নেই। আমি পাগল না হলে কী আর তোমাকে এমন কথা বলতে পারি? কিন্তু তোমাকে আমার ঠিকই মনে পড়ে। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে তোমাকে আমার মনে পড়ে। মনে পড়বেই না কেন? তোমার-আমার সেই দিনের পুরনো কথাগুলো যে আমাকে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রথম যেদিন তুমি আমাকে বন্ধুত্বের আহ্বান করলে সেদিন আমি কিন্তু তোমাকে পাত্তাই দেইনি। আমি একজন ছেলে হয়ে তোমার প্রথম বন্ধুত্বের আহ্বান ফিরিয়ে দিয়েছি, তবুও তুমি পর পর কয়েক দিন চেষ্টা করার পর আমি তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি। আমি কী কোনো মহানায়ক ছিলাম যে, তোমার মতো এমন একজন সুন্দরী মেয়ে আমাকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে আহ্বান করার পরেও প্রথমে সাড়া দেয়নি। না, আমি মোটেও কোনো মহানায়ক বা সাধারণ, অসাধারণ কোনো নায়ক ছিলাম না। আমি ছিলাম সরল-সহজ একজন সাধারণ ছেলে, এখনো তাই আছি। তবে কেন তোমার মতো একটা মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব করতে আপত্তি ছিল? আসলে তোমার আগে আমার আরো কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল। তারা আমার সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্বের ভালো ব্যবহার দেখিয়ে সরল মনে দাগ দিয়েছে। আমি তাদের মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম। আমি জানতাম যে, জীবনে চলার জন্য মানুষের বন্ধুত্বের প্রয়োজন আছে, এও জানি যে বন্ধু ছাড়া মানুষ একা চলতে পারে না। তাই তো আমি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলাম। কিন্তু তারা কি করল জানো? আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে প্রতারণা করলো, আস্তে আস্তে কুড়ে কুড়ে আমাকে যেন শেষ করে দিচ্ছিল। কিভাবে কি করল তারা আমার সঙ্গে সে বর্ণনা নাইবা দিলাম। সে কথাগুলো বলতে গেলে কষ্ট আমার বাড়তে থাকবে। তারা আমার সঙ্গে বন্ধুত্বের নামে প্রতারণা করে চলে যাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত নেই যে, আর জীবনে কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমি এসে আমাকে যেন চুম্বকের মতো টেনে নিলে। প্রথমে তো পাত্তা দিইনি। কিন্তু একের পর এক যখন তুমি আমার পিছু লেগে থাকতে শুরু করলে তখন আমার মনটাকে একটু নরম করলাম। দেখে না শেষবারের মতো তোমার সঙ্গে বন্ধুত্বটা করে। তাই তো হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম বন্ধুত্বে। হ্যাঁ, তুমি আমার শেষ বন্ধু হলেও খুব ভালো একজন বন্ধু ছিলে। তোমার সব কথা আমার সঙ্গে শেয়ার করতে। আমি আস্তে আস্তে তোমার সঙ্গে আমার দুঃখ, কষ্ট, বেদনার কথাগুলো শেয়ার করতাম। তোমার সঙ্গে মিশে বুঝতে পারলাম যে, আমার চেয়ে তোমার মনে অনেক কষ্ট। তোমার মা নেই, তোমাকে আট বছর বয়সে রেখে তোমার মা মারা যায়। তোমার বাবা আবার দ্বিতীয় বিয়ে করে। তোমার সৎ মা তোমাকে ভালোবাসতো না। অনেক কষ্ট দিত। তোমাকে দিয়ে কাজের বুয়ার চেয়েও বেশি কাজ করাত। এছাড়াও আরো নানানভাবে তোমাকে কষ্ট দিত। তাছাড়া তুমি একটা ছেলেকে ভালোবেসেছিলে তাও আমার সঙ্গে শেয়ার করেছো। ছেলেটি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তোমাকে ঠকিয়েছে। ভালোবাসার অভিনয় করে তোমার দুচোখে শুধু স্বপ্ন এঁকে দিয়ে অন্যকে নিয়ে ঘর করছে। তোমার মতো আমার বেলাতেও হয়েছে। তোমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে আমাকেও দুয়েকজনে ভালোবাসি বলে স্বপ্ন দেখিয়ে চলে গেছে। তবে আমার চেয়ে তোমার কষ্টগুলো অনেক বড় মনে হয়। যখন তোমার কষ্টের কথাগুলো শুনতাম তখন আমি আস্তে আস্তে তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে যেতে থাকি। তোমার কষ্টে আমি কষ্ট পেতে থাকি। তোমার কষ্টের ভাগিদার হতে চাই। কিন্তু তা আর হতে পারলাম না। একদিন সকালে শুনতে পেলাম যে, তুমি নাকি ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলাতে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছো। প্রথমে তো আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে, তুমি আত্মহত্যা করেছো। আমি দেখতে গিয়েছিলাম তোমার লাশ। তোমার মরা মুখ দেখে আমি বলেছিলাম যে, তুমি মরনি, ঘুমিয়ে আছ। আমার কথা শোনে অনেকে পাগল বলেছে আমাকে। আমার কাছে মনে হয়েছিল যে, তুমি সত্যি সত্যি ঘুমিয়েছিলে। তখন সবার সামনে একটুও কাঁদিনি। কিন্তু বাসায় আসার পর আমি গোপনে অনেক কেঁদেছি। এখনো তোমার জন্য আমার দুচোখে জল ঝরে। তোমার কবরে যখন আমি মাটি ছুঁই তখন আমার বুকের ভেতরটা যেন দাউ দাউ করে জ্বলে। এতটা কষ্ট এখনো আমি তোমার জন্য পাই। যদি বেঁচে থাকতে তাহলে তোমাকে ছাড়া আমার জীবন সাথী আর কাউকে করতাম না। আজো তোমাকে ভেবে দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। তোমাকে অনেক, অনেক মনে পড়ে। খুব মিস করি তোমায়। মোঃআসাদ রহমান কোটচাঁদপু, ঝিনাইদহ

তবুও ভালো বাসি তোমায় ২০২০

জানুয়ারি ১৪, ২০২০ 0
তবুও ভালো বাসি তোমায় ২০২০
একালের ভালবাসা আর সেকালের ভালবাসা তা আনেক ভিন্ন। আজকাল ভালবাসা টা একটা স্মার্টনেছ এ পরিনত হয়ে গেছে। সেকালের ভালবাসা ঃ প্রেমিক-প্রেমিকা দেখা করত কোন এক নিবিড় পরিবেশে। এক পলকে মিটে যেত সকল আশা। একবার দেখা করতে কয়েক মাস বা কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হত। দূরে থেকে যোগাযোগ করার একটাই মাধ্যম ছিল চিঠি। ভালবসি কথাটা বলতে লেগেছে অনেক সময়। এরপর বিয়ে ===> একালের ভালবসা ঃ আজ ভাল লাগা, কাল কথা বলা। ৩য় দিন আর একটু গভীরতা। পরের দিন কোন চাইনিজ রেস্তোরায় গিয়ে একটা লাঞ্চ সেরে নিয়ে, কোন খোলা রাজপথে লং ড্রাইভ দেয়া। তার পরের দিন কোন এক নির্জন যায়গাতে গিয়ে প্রেমের পরিনতি লাভ করা। এই তো সুখ। আজ কাল মানুষের ব্যস্ততা এত বেশী যে প্রেম মধুর হওয়ার আগেই তার পরিনতিটাকে পেতে চায়। কি জানি ?হয়তএতেই একালের মানুষ গুলো সুখ পায়। এটাই হয়তো একালের ভালবাসার রীতি নীতি। তবে যাই হোক না কেন......... ভালবাসা কিন্ত তার অবস্থানেই আছে। এভাবে আর সেভাবে, একালে আর সেকালে যাই হোক মানুষ ভালবেসেই যাচ্ছে। এই ধারা চলতে থাকবে আজীবন। ধরণ বদলে গেলেও প্রেম-ভালবাসা টা কিন্ত প্রেম-ভালবাসা থাকবে আজীবন। জীবনে একটিবার হলেও সকল প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরকে বলবে," ভালোবাসি তোমাকে"।

আজও ভালো বাসি তোমাই

জানুয়ারি ১৪, ২০২০ 0
আজও ভালো বাসি তোমাই
I can't for get you “It’s hard to forget all about someone who gave you so many things to remember

Be good

জানুয়ারি ১৪, ২০২০ 0
মোঃআসাদ রহমান পৃথিবীর সুন্দরতম জিনিসগুলো হাতে ছোঁয়া যায় না, চোখে দেখা যায় না, সেগুলো একমাত্র হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়- ভালবাসা, দয়া, আন্তরিকতা।

What is Love? /ভালো বাসা কি?

জানুয়ারি ১৪, ২০২০ 0
ভালো বাসা কি? ভালোবাসা কি? সংজ্ঞা খুঁজে যাচ্ছি ডিকশনারির পাতা ঘেটে শেষ করে ফেলেছি নেট এ খুঁজে যাচ্ছি সেই কত কাল ধরে এখনো জানতে পারি নি ভালোবাসা কি। তোমার সাথে কথা না হলে যে কষ্ট হয় বুকে তার নাম কি ভালোবাসা? তোমায় না দেখলে মনটা যেমন উদাস হয়ে ওঠে সে কি ভালোবাসা? তুমি অভিমান করলে মনের মাঝে যে উথাল পাথাল ঝড় বয়ে যায় তার নামই কি ভালোবাসা? তোমায় খুঁজে না পেয়ে যে ছন্নছাড়া দিন কাটাই তাকে কি ভালোবাসা বলে? কি জানি কিছুতেই ভালোবাসার মানে বুঝতে পারি না। কেও বলে ভালোবাসা একটা অনুভুতি যা চাইলেও পাওয়া যায় না, আবার অনেক সময় না চাইতেও পাওয়া যায় কেও কেও এত বেশি পায় যে ভালোবাসার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে যায়; যেমন তুমি। আবার অনেকে ভালোবাসা না পেয়েও যন্ত্রণায় কাতরায় ভালোবাসার কাঙাল হয়ে থাকে যেমন আমি, তোমার ভালোবাসার পথ চেয়ে থাকি আর ভালোবাসার মানে খুঁজে বেড়াই শুধু তুমিই বোঝো না কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান ধরে থাক আমায় কষ্ট দিতে। ভালোবাসা কি জ্যোৎস্নার চেয়ে সুন্দর ভালোবাসা কি কবিতার চেয়ে কষ্টের ভালোবাসা কি ফুলের সৌরভ ভালোবাসা কি সাগরের বিশালতা কিংবা নদীর বয়ে যাওয়া জল আমি বুঝতে পারি না আমার কাছে ভালোবাসা মানে তোমার বাড়ানো হাত আমায় কাছে টানার কিংবা "শুধুই তুমি"। আমি কষ্ট কষ্ট সুখ পেয়ে যাচ্ছি তোমার প্রতিক্ষার প্রহর গুনে

শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

আমাকে একটু ভালোবাসবি

ডিসেম্বর ২৭, ২০১৯ 0
আমাকে একটু ভালোবাসবি
আমাকে একটু ভালোবাসবি ~কেন ~মানুষ কেন ভালোবাসে জানিস না তুই ~না তুই বল ~মানুষ নিজের সাদাকালো জীবনটাকে রঙিন করতে ভালোবাসে ~আমার জীবন তো রং চটা আমি কারো জীবনকে রঙিন করতে পারবোনা ~তুই পারবি একটু চেষ্টা করে দেখ ~ঠিক আছে একটু ভেবে দেখি ~আচ্ছা তুই ভাবতে থাক আমি আছি কিছু সময় পর………. ~আমি পারব না রে আমাকে দিয়ে হবে না ~তুই ঠিক পারবি ~আচ্ছা তোকে ভালবাসলে তুই আমাকে কি দিবি ~তোকে দেবো একশত একটা নীল পদ্ম তোর কপালে ঠিক মাঝখানে ঠাঁই পাবে একটা নীল টিপ তোর দু হাত ভরিয়ে দেব কাচের চুড়ি তে তোর চুলের খোপায় গুজে দেবো একটা রজনীগন্ধা ~না থাক আমার এত কিছু রাখার জায়গা নেই তুই বরং অন্য কাউকে খুঁজে নে ~আমিতো তোকেই খুঁজে নিয়েছি আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই ~আমি পারবো না রে ~তুই পারবি তোর চোখ দুটো বন্ধ কর ~কেন চোখ বন্ধ করে কি তোকে অন্ধের মত ভালবাসব আমি পারবো না চোখ বন্ধ করে তোকে অন্ধের মত ভালবাসতে ~আচ্ছা তুই যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ভালোবাসি তবুও একটু ভালবাস আমাকে ~আমি পারবো না রে ~কেন ~এমনিতেই ~আচ্ছা আয় তোকে ভালোবাসা শিখিয়ে দেই ~কিভাবে ~অলস দুপুরে ব্যস্ততার ক্ষণে আমাকে একটু মনে করিস হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমাকে একটু মনে করিস একটু ভাবিস যখন একা থাকবি তুই যখন কেউ থাকবে না তখন হঠাৎ আমাকে নিয়ে ভাবিস একটু ~এত কঠিন আমি পারবো না রে ~প্রথম প্রথম একটু কঠিন মনে হবে পরে দেখবি সব অনেক সহজ হয়ে গেছে ~চল এখন ~কোথায় ~বাড়িতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে ~তুই যা আমি যাব না ~সন্ধ্যা হয়ে গেছে এখন বাড়ি যেতে হবে চল ~কিন্তু আমার ভালোবাসার কি হবে ~আরে ধুর এত ভালোবাসা ভালোবাসা করিস কেন ~ ~ভালোবাসাই তো সব ~ভালোবাসা ভালোবাসা করিস পরে দেখবি ভালোবাসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছিস ~তাহলে তাই হোক আমি না হয় তোর ভালোবাসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাব ~হিহিহি ~হাসছিস কেন ~পাগল দেখছি তাই হাসছি ~পাগল কোথায় ~কোথায় আবার আমার সামনেই তো ~হ্যাঁ আমি তো তোর জন্যই পাগল ~অনেক পাগলামি হয়েছে এখন বাড়ি চল ~আমি যাব না তুই যা ~কেন রেগে গেলি ~না মরে গেছি ~আচ্ছা আমি যদি তোকে একটু ভালোনাবেসে অনেক ভালোবাসি তাহলে কি চলবে ~অনেক লাগবেনা আমার অল্প একটুই চাই ~আচ্ছা তোর যতটুকু লাগে ততটুকু নিয়ে অভাব পূরণ করিস আর বাকিটুকু আমাকে দিস ~সত্যি বলছিস ~হ্যাঁ সত্যিই তো বলছি ~পাগলী ~হ্যাঁ তোর পাগলী ~তোর হাতটা একটু ধরি ~কেন ~প্রেমের পথে হাঁটতে হলে ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে হাটতে হয় ~তাহলে শক্ত করে ধর ছারিস না ~বেচে থাকতে ছারবো না বিশ্বাস রাখতে পারিস ~আচছা তুই যাই বলছিস তাই হবে তোকে একটু ভালোবাসা দিলাম ~আচ্ছা আমিও দিলাম ~~~~~~~~~~ ❤❤❤❤❤❤❤❤………❤❤❤❤❤❤………❤❤❤❤❤❤❤❤……………

সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

দরজার ওপাশে ঘৃনা সংখ্যা

ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯ 0
দরজার ওপাশে  ঘৃনা  সংখ্যা
দরজার ওপাশে
১
টলমলে পায়ে হোণ্ডা থেকে নামে সে। টান দিতে গিয়ে টের পায় নিভে গেছে সিগারেটের আগুন। ‘ধুস শা..,’ খিস্তি দিয়ে ওঠে। মেসের গেটে ঢুকতে গিয়ে বাধা পায় দারোয়ানের কাছ থেকে।
‘এত রাতে ঢোকা নিষেধ। স্যারের মানা আছে।’
গালিটা চলে এসেছিল মুখের খুব কাছে। কিন্তু জাত মাতালেরাও তালে ঠিক থাকে। বেশি মেজাজ দেখালে পরে ঝামেলা হতে পারে। কি দরকার শুধু শুধু থাকার জায়গাটা হারানোর?
‘জলিল ভাই, কি করবো বলেন, হঠাৎ পুরান বন্ধুদের দেখা পাইয়া গেলাম। ছাড়তে চাইলো না...’,বলতে বলতে দারোয়ানের বুকপকেটে কড়কড়ে দুইটা নোট ঢুকায়ে দেয়।
দারোয়ান আর কথা বাড়ায়ে সময় নষ্ট করার মানে দেখে না। ‘ঢুইকা পড়েন, পরেরবার আর দেখবার পারুম না কইলাম।’
মনে মনে কষে বাপ-মা তুলে একটা গালি দেয় সে। মুখে তোয়াজের তুবড়ি ছোটায়ে ভেতরে ঢোকে।
ভেজানো দরজা গলে রূমে ঢুকেই সটান বিছানায়। চার বিছানার কামরা। মধ্যবিত্ত পরিবারের ভয়ে ভয়ে আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখা তিন তরুণের কেউই এত রাতে আর ওর তামাশা দেখার জন্য জেগে নেই। 

২
পরদিন সোয়া এগারোটার আগে নিদ্রাদেবী আলিংগন মুক্ত করে না। এত দেরীতে আর মেসে সকালের খাবার জুটবে না। আর ওসব ছাইপাশ মুখেও রোচে না তার। রাতে ঘরে ঢুকে কাপড় চোপড় পাল্টানো হয়নি। আশেপাশে কেউ থাকলে এখনো মুখ থেকে কাল রাতের বিটকেলে কটু গন্ধটা পেত নিশ্চয়ই। তেমন কেউ নেই আশেপাশে। রুমমেটদের সাথে তার তেমন দেখা সাক্ষাত ঘটে না। বাথরুম থেকে ঘুরে এসে বাসি কাপড় পালটে গায়ে দামী সেন্ট স্প্রে করে ফিটবাবুটি সেজে ঘর থেকে বেরোয় শাম্‌স। হ্যাঁ, ওইটাই মহামান্য পিতৃপ্রদত্ত নাম তার। পিতার দেওয়া সবকিছুকেই ঝেড়ে ফেলা গ্যাছে, নামটা আর ঝুলিয়ে রেখে কী হবে? ভেবেছে অনেক। তবু ঝাড়তে পারেনি শেষমেষ। বন্ধু-বান্ধবের কাছে এখনো নামটা জিন্দা আছে। অবশ্য সমস্যা বিশেষ নেই তাতে। রিয়েল প্রফেশনে ও বহুনামধারী।
হেলতে দুলতে সামনের গলির রফিক চাচার রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে শাম্‌স। চাচার রেস্টুরেণ্টে টাইমের কোন হিসাব নাই। যখন তখন যেটা খুশী সেটা পাওয়া যায়। দেদার ব্যবসা। পেটের মধ্যে গোটা তিনেক খাস্তা পরোটা আর খাশীর নিহারী চালান করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে। পকেট থেকে লেটেস্ট মডেলের দামী স্মার্টফোনটা বের করে দেখে, উনত্রিশটা মিসড্‌কল। কুছ পরোয়া নেহি। পরিস্থিতি সামাল দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। ফোন লাগায় নির্দিষ্ট নাম্বারে। একবার রিং বাজতেই ফোন রিসিভ হয়।

‘হ্যালো। কি ব্যাপার, কই থাকো তুমি? ফোনটা পর্যন্ত ধরতে পারো না? জানো কয়বার কল দিছি আমি? কি করতাছিলা, এ্যাঁ?’
‘ ওহ্‌ ডার্লিং, মাই সুইটি। তুমি তো জানোই, রাত জেগে পড়াশুনা করতে হয়। সামনে এক্সাম। ভাল না করতে পারলে তোমার বাবা-মার কাছে আমার কথা বলতে পারবা? ফোনটা সাইলেণ্ট মোডে ছিল।’
‘তাই বলে তুমি আমার কলও দেখবা না?’ ওপর পক্ষের গলা ইতিমধ্যেই নরম হয়ে এসেছে।
মনে মনে হাসে শাম্‌স। মেয়েমাইনসের জাত। ন্যাকামি দেখাইবার বেলা ষোলআনা। একটা মিথ্যা কথারও গন্ধ বুঝবার পারে না।
দুনিয়ার সব মেয়েমানুষই বোকার হদ্দ, আর হাড়ে হাড়ে বজ্জাত। খালি বোঝে উপরের ফিটফাট, চাকুমচুকুম কথা। ভদ্রভাবে কথা বলতে গেলে এমন ভাব দেখাবে যেন সতি-সাবত্রী, যার তার সাথে কথা বলে না। একটু রংবাজি দেখাও, ব্যস। গলে একবারে পান্তাভাত। তখন আর কোন লাজ-লজ্জা কিছুই নাই। এমনি এমনি মেয়েদের সম্পর্কে এমন ধারণা হয়নি, দশ-বারো বছরের অভিজ্ঞতা এই লাইনে।
বাপের সাথে কানেকশন কাট করে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ঢাকা শহরে। বাবা খোঁজ জোগাড় করে পেছনে ফেউ লাগিয়ে দেয়। কত আর বয়স তখন? মাত্র তের-চৌদ্দ বছর। ছোট চাচারে অনেক ভালোবাসতো সে। ছোট চাচা এসে যখন তার মেসে ওকে নিয়ে গেল, ওর খুশী তখন দেখে কে? রসাতলে যাক দুনিয়া। এখন থেকে ছোট চাচাই তার বাপ-মা। ওর দেখাশোনার জন্য ছোট চাচাকে বাবাই দায়িত্বটা দিয়েছিল, বুঝতে পারেনি সে। ছোটচাচা তখন চাকরি বাকরির ধান্ধা করছে। শাম্‌স থেকে যায় তার সাথে। খরচপাতি কে চালাচ্ছে এটা চিন্তা করার মত মগজ হয়নি তখনো। পড়াশুনা করানোর অনেক চেষ্টা করে ছোটচাচা, কিন্তু শাম্‌সের পড়াশুনায় মন বসে না। ঐটুকুন বয়সেই দুনিয়ার সকল সুকুমার বস্তুর উপর থেকেই মন উঠে গেছে তার। আশপাশ থেকে বন্ধু-বান্ধবও জুটে যায় নিজের লেভেলের। সারাদিন তাদের সাথে মৌজ-মাস্তি, নিষিদ্ধ নেশা...অনেক কিছুই শিখে যায় সে। ঘর না, ওকে ব্যাকুলের মত টানতো বাইরের দুনিয়া। ছোটচাচা শাম্‌সের বেহাল এই দশা দেখে অনেক চেষ্টা তদবির করে ওকে ফেরানোর। কিন্তু শাম্‌সের দুনিয়াটাই তখন বদলে গেছে। ও এখন আর কারোরই পরোয়া করে না। শেষমেষ চাচাও ওর দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
শাম্‌স ততদিনে দুনিয়া চিনে গেছে। কিন্তু হাতে টাকা না থাকলে আর কিসের দুনিয়া? এক বন্ধু চিনিয়ে দেয় জব্বর এক রাস্তা। বড়লোকের মালদার মেয়ে পটানোর কাজ। মেয়ে পটাও আর তারপরে মাথায় কাঁঠাল ভাংগো। ব্যাপক মনে ধরে এই কাজ তার।
আর এই লাইনে কঠিন পারদর্শীতার পরিচয় দেয় সে। মিনিমাম ইনভেস্টমেণ্টে কিভাবে ম্যাক্সিমাম ফায়দা হাসিল করা যায় অল্প দিনেই শিখে ফেলে। এই কাজে তার প্রয়োজন হয় মাত্র দুটি জিনিস। এক, একটি মোবাইল ফোন আর দুই, গোটা দশ-বারোটার মত সিমকার্ড। তারপর মোটামুটি মালদার পার্টি খুঁজে খুঁজে বের করে ফোন দেওয়া। ফোন নাম্বার বের করা তো বাঁ হাতের কাজ। পার্টি পটানোই হচ্ছে আসল কাজ। কিন্তু এই ব্যাপারে শাম্‌সের আছে শতকরা একশ ভাগ নিশ্চয়তা। এমন কোন মেয়ে সে পায়নি যাকে সে পটাতে পারেনি। একেক পার্টির জন্য একেক রকম দাওয়াই। পার্টিকে দু’একদিন ফলো করলেই এব্যাপারে বুঝতে আর কোন অসুবিধা হয় না যে, কোন দাওয়াই দিতে হবে। ব্যস, তারপরে মনের আনন্দে যত পারো খসিয়ে নাও। মেয়েগুলোন যে এত রামছাগল! বিন্দুমাত্র সন্দেহ করে না। এই খেলার শেষ অংশে সে একটা বড় দাও মারে। ইমোশনাল কোন একটা ব্ল্যাকমেইল করে মেয়েগুলোর কাছ থেকে বেশ বড় অংকের টাকা নিয়ে নেয়। তারপর, সিমকার্ড বদল...পাখি উড়াল। তবে এখন পর্যন্ত কোন মেয়েরই সে বড় কোন ক্ষতি করেনি। যেটা সে চাইলেই অনায়াসে করতে পারতো। বিবেকের কোন একটা জায়গায় এখনো হয়তো কিছু একটা বোধ ফোধ কাজ করে।
আপন মনেই হাসে শাম্‌স। বোধ!! হাহ্‌! দুনিয়ার সব মেয়ে জাতের সে শেষ দেখে ছাড়বে। যতদিন পর্যন্ত না ঐ একটা মুখ ভুলতে পারে। ওর জন্মদাত্রীর মুখ!



৩
পেছন ফিরে তাকাতে রুচি হয়না শাম্‌সের, ইচ্ছাও। মাত্র সাত বছরের শিশুপুত্রকে ফেলে কোন মা পরপুরুষের সাথে চলে যেতে পারে! বাবা ছোটখাট ব্যবসা করলেও অভাব ছিল না ওদের। প্রাচুর্য্যও হয়তো ছিল না তেমন। কিন্তু অভাব ছিল ওর মার মনে। মা কোনদিনই সুখী হতে পারেনি ওর বাবাকে নিয়ে। তার ছিল বিলাসের মোহ, অর্থের আকাশচুম্বী লিপ্সা। তরুণী মা নিজের মান-সম্মান বিসর্জন দিয়ে এক পয়সাওয়ালা বড় ব্যবসায়ীর হাত ধরে চলে যায়। একটিবারের জন্যও পেছন ফিরে দেখার প্রয়োজন মনে করে না।
শাম্‌সের ভালোমানুষ সাধাসিধে বাবা অনেক কষ্টে এই প্রচণ্ড ধাক্কা সামলে ওঠে। অবুঝ শিশুপুত্রকে পরম স্নেহে আগলে ধরে তার বাবা। সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতনে কেটে যায় বাপ-ছেলের দিনগুলো। কিন্তু আবার ঝড় ওঠে। এবার অবশ্য হঠাৎ করে না, বেশ বলে কয়েই ওঠে ঝড়।
ওর বয়স যখন তের কি চৌদ্দ, বাবা ওকে নানাভাবে বোঝাতে থাকে যে ওদের জীবনে একটা পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। এমন কাউকে প্রয়োজন, যে ওদের বাড়িটা দেখেশুনে রাখবে, ওদের খেয়াল রাখবে। ঐ বয়সেই শাম্‌স বুঝতে পারে যে, বাবা কাউকে খুঁজে পেয়েই বিষয়টা কেবল ওর কাছে হালাল করে নিচ্ছে। ওর মতামতটা একটা বাহানা ছাড়া আর কিছু না। প্রচণ্ড অভিমান হয় ওর। মা চলে যাওয়ার পর ও যতবারই ‘মা’ বলে কেঁদেছে ততবারই একটা শক্ত হাত ওকে জড়িয়ে ধরেছে প্রবল স্নেহে। সেই শক্ত হাতটার প্রয়োজন তো ওর এখনো ফুরিয়ে যায়নি। 
শাম্‌সের বাবা অনেক চেষ্টা করেও ওকে বোঝাতে পারেনা। কিচ্ছু বুঝতে চায়না সে। নিজের মা ই ওকে ফেলে চলে গেছে, নকল মা কোন্‌ কাজে আসবে? কিন্তু বাবা কেন এরকম করবে এই ভেবে একদিন ছেলেমানুষি ভীষণ এক তাড়নায় বাড়ি ছাড়ে শাম্‌স।

ছোটচাচার মেসে অনেকবারই বাবা এসেছেন, শাম্‌সকে ফিরে যাবার জন্য অনেক কাকুতি মিনতি করেছেন। কিন্তু কিশোর এক ছেলের মনে কিসের যে তীব্র জেদ শিকড় গেড়ে বসে থাকে, কেউ তা বুঝতে পারে না। ছোটচাচার অনেক অনুরোধে প্রায় বছর দেড়েক বাদে একবার গিয়েছিল চাচার সাথে ওদের বাসায়। একটা বাচ্চা মেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরময়, দেখে এসেছে। নকল মা খুব খাতিরদারি দেখানোর চেষ্টা করেছে। বার বার শাম্‌সকে থাকতে বলেছে। অভিনয়...সব অভিনয়, জানে শাম্‌স। একবার থাকলেই ওর ঘাড়টা একদিন ঠিক মটকে দেবে ঐ ডাইনী। আর যায়নি কোনদিন তারপরে। দিন চলে গেছে আপন গতিতে, শাম্‌সের জীবনধারার প্রচণ্ড গতির সাথে পাল্লা দিয়েই।

৪
মেসে ফিরেই আবার বিছানামুখো হয় শাম্‌স। আজ ভাল্লাগ্‌ছেনা শরীরটা। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে থাকে। এমন সময় আবার বেজে ওঠে ফোনটা। ছোট চাচা ফোন করেছেন! কি ব্যাপার? বাবা কিংবা চাচা কারো সাথেই কোনরকম যোগাযোগ করে না সে। তারাও হাল ছেড়ে দিয়েছেন একরকম।
‘তুই কোথায় আছিস?’
‘কোথায় আবার! মেসেই আছি। কেন কি হয়েছে?’
‘আমি আধাঘণ্টার ভেতর আসছি। কোথাও যাবি না।’
শাম্‌স অবাক হয়। আধাঘণ্টার আগেই ছোটচাচা চলে আসে। কেমন যেন উদভ্রান্তের মত চেহারা।
‘কাল রাতে ফোন ধরিসনি কেন? ...দাদা চলে গেছে রে।’ হু হু করে কেঁদে ওঠে ছোটচাচা।
শাম্‌স দাঁড়িয়ে থাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। অনেক কথা হুটোপুটি খায় মনের মধ্যে। বাবা ওকে অনেকদিন ফোন করে বাসায় আসতে বলেছেন। অনেক কথা বলতে চেয়েছেন। নিজের কৃতকর্মের কৈফিয়ত দিতে চেয়েছেন অসংখ্যবার। শাম্‌স কোন কথাই শুনতে চায়নি। যেন পৃথিবীর কারো কাছেই ওর কিছুই চাইবার নাই। 
‘কাল সারারাত তোর ফোন বন্ধ ছিল। দুপুরের দিকে হঠাৎ হার্টএটাক। ভাবির ফোন পেয়ে হাসপাতালে যাই। বিকেলের মধ্যে সব শেষ।’
শাম্‌স হঠাৎ আবার নিরুৎসাহী হয়ে পড়ে। আছেই তো সবাই। ওর বাবাকে শেষবিদায় জানাতে ওর যাওয়ার কি এমন প্রয়োজন?
‘চল্‌, আমার সাথে,’ ছোটচাচা ওকে রাজি করাতে আসেনি, ওকে নিয়ে যেতে এসেছে। চাচার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, শাম্‌স কথা বাড়ায় না। নিঃশব্দে যেতে থাকে চাচার পিছু পিছু।

৫
ওরা যাবার পর বাবার দাফন হয়। বাবার লাশের পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে শাম্‌স। কাঁদতে পারে না।
দাফন শেষে মেসে ফিরতে গিয়ে বাধা পায় শাম্‌স। ওর সৎমা ওকে আজ রাতটা থেকে যেতে বলে। একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকায় মহিলার দিকে। মুখটা ভীষণ শুকনো, চোখগুলো কাঁদতে কাঁদতে ফুলে আছে। চোখে কেমন যেন মমতার ছায়া। শাম্‌স নিজেকে অবাক করে দিয়ে সেই রাতটা থেকে যেতে রাজি হয়ে যায়।
মা-মেয়ে শোকের মাঝেও শাম্‌সের জন্য এটা ওটা করতে থাকে। বড় বড় চোখের কিশোরী মেয়েটার মুখে রাজ্যের কৌতুহল আর আগ্রহের মাখামাখি। শাম্‌সের পাত্তা না পেয়েও ‘ভাইয়া’ ‘ভাইয়া’ করতে থাকে। খুব যত্ন করে ওকে খাওয়ায় মা আর মেয়ে। আয়োজন অতি সামান্য। মরা বাড়ি, কে রান্নাবাড়ি করে! প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে কিছু তরকারি দিয়ে গেছে, সেটা দিয়েই আজকের আয়োজন। খাওয়া শেষে ওর সৎবোন ওকে থাকার ঘরটা দেখায়। শাম্‌স দেখে ও যেই ঘরে থাকতো, সেই ঘরটাই। এরমধ্যেই মেয়েটা সুন্দর করে গুছিয়ে ফেলেছে ঘরটা । বিছানায় নতুন চাদর বিছানো। পরিপাটি যত্ন আর মমতার ছাপ সারাটা ঘর জুড়ে।
পরদিন সকালে উঠেই শাম্‌স যাওয়ার জন্য তৈরী হয়ে যায়। ভদ্রমহিলা এসে দাঁড়ায় সামনে।
‘তুমি চলে যাবা বাবা? থাকো না আমাদের সাথে! আমাদের আর কে আছে? মেয়েটা বাবাকে হারিয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিল। তোমাকে পেয়ে একদিনেই কেমন সব ভুলে গেল! তোমার বাবার যা আছে সবই তো তোমার। মেয়েটাতো বিয়ের পরই চলে যাবে। আর আমি...আমার একার বেঁচে থাকার জন্য কতটুকুই বা লাগে!’
শাম্‌সের মনে পড়ে যায় ওর মার কাছে বাবার এই সম্পদটুকু বড়ই সামান্য মনে হয়েছিল। আর সেজন্য ওকে ফেলে যেতেও দ্বিধা করেনি ওর নিজের মা!
শাম্‌স কোন কথা না বলে ঘরের দরজা খুলে সামনে এগিয়ে যায়। টের পায় ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে মা-বোন। অনিশ্চিত পায়ে এসে দাঁড়ায় বাড়ির সামনের লোহার গেটটার কাছে। 
ভীষণ অভিমানী এক মানুষ সে। সেই শৈশব থেকেই এক প্রচণ্ড অভিমান বয়ে নিয়ে চলেছে হতভাগ্যের মত। এতদিন জেনে এসেছে তার নাম ঘৃণা। ঘৃণার অপরপাশে কোন ভালোবাসার দাবী বা আকুলতা যে ওত পেতে আছে মনে হয়নি কখনো। হঠাৎ ঝাপ্সা হয়ে যেতে থাকে ওর সামনের সবকিছু। গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে কিছু একটা। সামনে তাকিয়ে কিচ্ছু দেখতে পায় না সে।
আর কি আশ্চর্য! লোহার গেটটা এত শক্ত হয়ে গেল কিভাবে? শত চেষ্টা করেও গেটটা খুলতে পারেনা শাম্‌স। 
ভ্যাবাচ্যাকার মত দাঁড়িয়ে থাকে গেটটার এপাশেই।