বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৯

শেষ প্রহরে বৃষ্টি

গল্প: "শেষ প্রহরে বৃষ্টি" ( পর্ব ৩) লেখা- সূর্যস্পশ্যা তনয়া বাসায় ফিরে আমি স্বাভাবিক থাকলাম।রাতের খাবার খাইয়ে সাহিলকে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। তারপর খুব কৌতুহল নিয়েই স্যারকে জিগ্যেস করলাম,আজকে শপিংমলে মেয়েটা কে ছিলো? স্যার গভীর দৃষ্টি নিয়ে বিস্ময়ে আমার দিকে তাকালেন, - জানাটা কি খুব জরুরী? - জানতে চাওয়াটা কি আমার অপরাধ হইছে? - সব বিষয়ে না জানায় ভালো। - কোন বিষয়ে জানতে চাইছি আগে? না আপনি নিজ থেকে কিছু বলেন না আমি জিগ্যেস করি..আজকে আপনাকে বলতেই হবে ওই মহিলা কে? - সাহিলের আম্মু - মানে কি? সাহিলের আম্মু মৃত না? - আমি কি কখনও বলেছি সাহিলের আম্মু মৃত? - তাহলে আপনারা একসাথে থাকেন না কেন? আপনাদের কি ডিভোর্স হয়েছে? - নাহ,দেখেন এত কিছু আমি বলতে বাধ্য নয় - আপনি বলতে বাধ্য,সাহিলের আম্মু বেঁচে থাকতেও কেন ও আম্মু ছাড়া থাকবে? - কেন সাহিল আমার সাথে থাকলে কি আপনার খুব অসুবিধে হচ্ছে? (কথাটা শোনামাত্র টুপ করে কয়েকফোটা পানি আমার চোখ থেকে পড়ে গেলো।আর কিছু বলতে পারলাম না,এখানে দাঁড়িয়ে থাকতেও বিরক্তি লাগছে,আমি দৌড়ে রুমে চলে গেলাম। ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে কান্না করতে লাগলাম) বলে কি রে,যে সাহিলের জন্য নিজের শখ আহ্লাদ, খুশি বিসর্জন দিয়ে দিনের পর দিন অবহেলা অপমান মাথায় নিয়ে এখানে পড়ে আছি,তাকে নিয়ে নাকি আমার অসুবিধে। ছিঃ এও শোনার বাকী ছিলো। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গেছি বুঝতে পারিনি। ভোরে দরজা টোকানোর শব্দে ঘুম ভাঙলো। কিন্তু দরজা খুলে কাউকে পেলাম না। স্যারের রুমে যেয়ে দেখি সাহিল ঘুমোচ্ছে।ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে নামাজ পড়তে গেলাম। তারপর রান্নাঘরে যেয়ে সাহিলের সবজি খিচুরির জন্য পানি বসালাম চুলোয়। একটুপরে দেখি স্যার রান্নাঘরে এসে সবজি কাটা শুরু করলেন। দুজনেই কাজ করছি কেউ কারো সাথে কথা বলছি না,অবশ্য ২ মাস ধরে এমনি চলছে আমাদের। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলিনা। তবে আজকের ব্যাপারটা অন্যদিনের মত না।কেমন যেন থমেথমে পরিবেশ। সবজির টুকরা গুলা এনে উনি পাতিলে দিলেন আমি পাশে দাড়িয়ে ছিলাম তাই সরে গেলাম। রান্না শেষ করে সাহিলকে খাওয়ানোর জন্য রুমে গেলাম। স্যারও আসলেন,সাহিলকে কোলে নিয়ে ব্রাশ করাতে গেলেন,আমি বেড গুছালাম। আসতে আসতে স্যার সাহিলকে বলছে, সাহিল,চলো কোথাও বেড়াতে যায়,কোথায় যাবে বলো তো? - শিশুপাল্কে যাবে আব্বু? - না,অন্য কোথাও।এই যেমন,সমুদ্র, পাহাড়,ঝর্ণা,বনজঙ্গল... ... - আমি সমুদ্রে যাবো... - আচ্ছা তাই হবে,চলো এখন খেয়ে নাও।আম্মু খাবার নিয়ে বসে আছে। আমি সাহিলকে খাইয়ে দিতেছি। স্যারের দিকে চোখ পড়তেই দেখি উনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিলেন।আমার বুকের ভিতরে কেমন যেন ধরফর করে উঠল। এই দুইমাসে হয়তো এই প্রথম আমার দিকে এভাবে তাকালেন। না আমার ওনার প্রতি কোনো ফিলিংস কাজ করে,আর না ওনার আমার প্রতি। ছেলেদের প্রতি একটা ধারণা ছিলো যে,ছেলেরা কোনো মেয়ের থেকে দূরে থাকতে পারেনা,একা পেলেই সুযোগ নেই। কিন্তু স্যার আমার ধারণাটা একেবারে মিথ্যে প্রমাণ করেছেন।উনি আমাকে ছাত্রী হিসেবে ভেবে হোক বা উনার অযোগ্য ভেবেই হোক উনি আমার প্রতি কখনও কোনো দূর্বলতা দেখাননি। সবসময় ওনার কথাতে স্পষ্ট বিরক্তিভাব দেখেছি আমার প্রতি।মনে মনে ওনার স্ত্রী হওয়ার আশাও ছেড়ে দিয়েছি।এইভাবে কতকাল চলবে তাও জানি না। টেবিলে খাবার বাড়তে যেয়ে দেখি একটা কাগজে লেখা," Sorry" আমি সত্যি অবাক হয়ে যাই,কখনও প্রেম করিনি কিন্তু মনে হচ্ছিলো প্রথম যখন কেউ ভালোবাসি বললে ফিলিংসটা সেমনই ছিলো।আমার হাত কাঁপছিলো। হঠাৎ পিছনে তাকিয়ে দেখি স্যার কান ধরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি অনেক বেশি লজ্জা পাই। স্যারের কাছে এমনটা আমি কখনই আশা করিনি। আমি খুশিতে স্যারের হাত ধরে ফেলেছি।হুশ হতেই জিভ কেটে সাহিলের কাছে পালিয়ে যাওয়ার সময় স্যারের হাস্যজ্জল মুখটা দেখতে পেলাম।হাসলে যে কোনো মানুষকে এতো সুন্দর লাগে,কাছ থেকে এই প্রথম দেখলাম। এর কয়েকদিন পরেই ওনার সেই খালা আমাদের বাসায় আসলেন। স্যার বললেন,খালার সেবাযত্নে যেন ত্রুটি না হয়,আর রাতে যেন আমি সাহিলের সাথে ঘুমাই। খালা তো আমাকে কিছু করতেই দেয় না বরং নিজেই আমাদের জন্য অনেক পিঠা,খাবার বানালেন।আমার চুলে তেল লাগিয়ে দিলেন।আর বকছিলেন,এতো বড় বড় চুল তবুও তেল দিইনা কেন। আর বলছিলেন,মা রে সৈকতকে কখনও কষ্ট দিস না।ছেলেটা জীবনে অনেক কষ্ট সয়েছে। যদিও আমি জানি না,ওনার কিসের কষ্ট,তবুও বুঝতে পারি ওনাকে দেখে,কষ্ট পেলে মানুষ কিভাবে পাথর হয়ে যায়। চলবে.....

কোন মন্তব্য নেই: