অসমাপ্ত ভালবাসা(পর্ব-১)
ভোর সকালে ফোনের রিংটোনে ঘুম ভেঙে যায় রিনির। ঘুম জড়ানো চোখে বিরক্তি নিয়ে ফোনের দিকে তাকাতেই একলাফে উঠে বসে যায় রিনি, চোখটা কচলাতে থাকে, ও স্বপ্ন দেখছে নাতো! এতো সকালে আবিরের কল! সকাল আটটায় যাকে ফোন করলে পাওয়া যায়না, সে কিনা আজ এতো সকালে রিনিকে ফোন করেছে!
সময় দেখতে গিয়ে আরো অবাক হয়ে যায় রিনি, সকাল ছয়টা বাজে মাত্র, কিছুটা ভয় আর কৌতূহল নিয়েই ফোনটা রিসিভ করে রিনি...
_ হ্যা আবির বলো, তুমি ঠিক আছতো?
_আরে হ্যা ঠিক আছি।
_এতো সকালে ফোন!কোনো দরকার?
_শোনোনা আজ না আমার প্রথম অফিস, বলছিলাম যাওয়ার আগে তোমার সাথে একবার দেখা করে যেতে চাই, তাহলে ভয়টা একটু কম লাগবে।
আবিরের কথাটা শুনে রিনি হোহো করে হাসতে থাকে, ছোট বাচ্চাদের মতো কথা বলছে আজ আবির। আবির ওপাশ থেকে রিনির হাসিটা মুগ্ধ হয়ে শুনছে আর ভাবছে একটা মেয়ে এতো সুন্দর করে কীভাবে হাসতে পারে! ও বারবার রিনির এই মাতাল করা হাসির প্রেমে পড়ে। রিনি এইবার হাসিটা কিছুটা থামিয়ে বলে...
_ পাগল একটা , তুমি কি যুদ্ধে যাচ্ছ নাকি, এতো ভয় পাচ্ছো। আমাকে দেখতে মন চাচ্ছে বললেই হয়। এত ভণিতা করার কি আছে,
_ বুঝতেই তো পারছ, তাহইলে রেডি হয়ে নাও, আর...
_আর কি!!!
_ বুঝতে পারছ না! এটাও বলে দিতে হবে!!! তাহলে তুমি আমার কেমন ...
_ওকে, অভিমান করতে হবে না মেয়েদের মতো।
_হুম, বাই।
_বাই।
কথা শেষ হতেই রিনি অবাক হয়ে যায়, আচ্ছা এইমাত্র ও কি আবিরের সাথেই কথা বলল নাকি অন্যকেউ! আবিরতো ওর সাথে কখনওই এতো ভালো করে কথা বলেনা। সব সময় ওকে ঝাড়ির উপর রাখে, ফোন করে একটু বেশিক্ষণ কথা বললেই ফোন রাখার জন্য উতলা হয়ে পড়ে। দেখা করতে চাইলে হাজারো বাহানা খোজে, আজ সেই আবির রিনির সাথে দেখা করতে চাইছে!
আবিরের অফিস নয়টায়, কিন্তু রিনির সাথে দেখা করার জন্য আগেই বেরুবে, আজ কেন জানি রিনিকে ওর খুব দেখতে ইচ্ছে করছে, সেই সাজে , প্রথম যেদিন রিনিকে দেখেছিল কালো শাড়িতে!
ভার্সিটির একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আবির আর রিনির দেখা হয়েছিল, সেখান থেকেই বন্ধুত্ব ,তারপর ভালবাসা। এরপর থেকে রিনি শাড়ি পড়তে চাইলেই আবির ওকে কালো শাড়ি পড়তে বলে। কালো শাড়িতে নাকি রিনিকে অসম্ভব সুন্দরী লাগে।
সাতসকালে রিনিকে শাড়ি পড়তে দেখে রিনির মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে..
_ কিরে রিনু , এই সকালে শাড়ী পড়ে কোথায় যাচ্ছিসরে?
রিনু কি বলবে ভেবে পায়না, একটু ইতস্তত হয়ে বলে...
_ মা, আসলে আমাদের ক্যাম্পাসে একটা অনুষ্ঠান আছেতো, মিলি ফোন করেছিল যেতে বলেছে, তাই...
_ ওহ! আচ্ছা যা তাহলে। বুঝিনা বাপু কিছু , ভার্সিটিতে পড়া শেষ হয়েছে মাস দু'য়েক হয়ে গেল এখনো ওইখানের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কি আছে! কিছু খেয়ে যাস।
_না মা, মিলির সাথে আজ বাইরে খাব।
_ আচ্ছা, তাড়াতাড়িই ফিরিস।
_হুম।
শাড়ী পড়া শেষে আয়নাতে নিজেকে আরেকবার দেখে নেয় রিনি। আচ্ছা কালো শাড়ীতে কি সত্যি ওকে সুন্দর লাগে নাকি আবির বাড়িয়ে বলে কিছু! নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেই লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয় রিনি।
আবির আজ রিনির আগেই পৌছে গেছে ওদের দুজনার সুন্দর মুহুর্ত কাটানো সেই নদীর পাড়ে! দূর থেকে রিনিকে দেখে চোখ সরাতে পারছে না আবির। দিন যত যাচ্ছে রিনি যেন আরো বেশি সুন্দর হয়ে যাচ্ছে আবিরের কাছে।
রিনি আবিরকে দেখে অবাক হয়ে যায়, আরো অবাক হয় যখন আবির ওকে কিছু চকোলেট দেয় । অবাক চোখেই আবিরের দিকে হাসিমুখে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়...
_এসব কি আবির! আমি কি ছোট বাচ্চা!!!
_তুমিইতো বলো আমি তোমাকে কিছু দেইনা, কিপটা, তাই আজকে...
_আবির! ইউ আর চেঞ্জড!!!
_বলতে পারো।এড় পেছনে একটা কারণ আছে,
_ কী কারণ ?
_গেইস করো...
_উম...পারছি না। বলোনা প্লিজ।
_ মা বলেছে চাকরি হয়ে গেছে এবার মাসখানেকের মধ্যে বিয়েটা সেরে ফেলতে।
_কিন্তু তুমিতো বলেছিলে যে তোমার মা বলেছে, যে পর্যন্ত তোমার নিজের বিয়ের খরচ নিজে যোগাড় করতে না পারবে সে পর্যন্ত বিয়ে নেই,
_হ্যা বলেছিল, কিন্তু এখন নাকি তার তর সইছে না। আর সেটা বলেছিল যাতে আমি কিছু একটা করি, যদিও আমার ছোটবোনের থেকে কথাটা শুনেছি, তবে মায়ের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে একমাসের মধ্যেই আমার বিয়ে দিয়ে ছাড়বেন।
আবির যতটা উৎসাহ নিয়ে রিনিকে কথাটা বলল, রিনি ততটা খুশি হলোনা, বরং ওকে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছে। আবির ওর মুখ দেখে জিজ্ঞেস করল...
_ কি হয়েছে রিন?তুমি খুশি হওনি?
_হুম। কিন্তু...
_কিন্তু কি?
_আমিতো বাবাকে বলে দিয়েছি ভাইয়া আমেরিকা থেকে না ফেরা পর্যন্ত যেন আমার বিয়ের কথা না বলে। ভাইয়া ফিরলেই আমি বিয়ে করে নেব। ভেবেছিলাম ততদিনে তুমি ভালো একটা চাকরি পেয়ে যাবে।
_হুম, তো এখন সমস্যা কি? বিয়ে তোমার ভাই আসলেই হবে। এখন কথাবার্তা বলে রাখলেই হবে।
_আচ্ছা তাহলে তুমি আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দেখ, কি হয়।
_ওকে।
ওরা দু'জন আরো কিছুক্ষণ কথা বলে , কিছু খাওয়াদাওয়া করে আবির অফিসের দিকে পা বাড়ালো আর রিনি গেল বাসার দিকে।
আবিরের প্রথমদিনের অফিস ভালই কাটল। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হতেই ওর মা ওকে ডাকল। অফিস কেমন কাটোল, কেমন লাগল এসব জানতে চেয়ে শেষে বলল...
_ আবির তোর কোনো মেয়ে পছন্দ আছে?
আবিরের খুশিতে লাফাতে ইচ্ছে করছে, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে রিনির কথা। কিন্তু ও ভাবল যে এখনতো ওর চাকরিও হয়ে গেছে, রিনিরও বিয়ের কথাবার্তা চলছে বাসা থেকে , তাহলে দু'জনের পরিবারের মাধ্যমেই বিয়েটা হোক, শুধু ঘটকের সাথে কথা বললেই হবে আবিরের। এসব চিন্তা করতে করতে ওর মা আবার বলতে লাগল...
_কিরে, বল, তোর কোনো পছন্দ আছে? তাহলে আর আমাদের কষ্ট করে মেয়ে দেখতে হবেনা।
_না মা, আমার কোনো পছন্দ নেই,তোমরা দেখো।
কিন্তু কথাটা বলে যে আবির কতবড় ভুল করছে সেটা ও নিজেও বুঝতে পারছে না।
ঘটককে আবির দেখল ওর বাবার সাথে কথা বলে বাসা থেকে বের হচ্ছে, এই সুযোগে ও রিনিকে ফোন করে নদির পাড়ে আসতে বলল, আর ঘটককে নিয়ে ও সেখানে পৌছে দেখল যে রিনি কমলা রঙের একটা ড্রেস পড়ে ওখানে হাজির।
ঘটক আবিরকে জিজ্ঞেস করছিল যে তার কেমন মেয়ে পছন্দ তা বলতে, আবির যেন রিনিকে এই প্রথম দেখছে, এমন ভাব করে বলল যে, "ওই যে দেখুন, ওইখানে কমলা ড্রেস পড়ে যে মেয়েটা বসে আছে, আমি ওই মেয়েটাকেই বিয়ে করতে চাই"।
এইটুকু বলতেই আবির দেখতে পেল ওর বড় আপু কল করেছে। ফোন রিসিভ করতেই ওর বোন ওপাশ থেকে কাপাকাপা কন্ঠে জানালো যে, ওর দেড় বছরের ভাগিনাটা কি না কি মুখে দিছে শুধু বমি করছে, ও তাড়াতাড়ি ঘটককে মেয়েটাকে দেখিয়ে ওখান থেকে চলে গেল।
ঘটক দেখতে পেল ওখানে দুইটা মেয়ে আছে কমলা ড্রেস পড়া। প্রথম মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করতেই সে জানালো তার নাম ইমি। পাশ থেকে রিনি সব দেখছে।
ইমির পরিচয় নেওয়া শেষ হলে ঘটক রিনির কাছে গেল। রিনি ফটাফট সব বলে দিল।
আবিরের বাবা,মা,বোন সবাই আবিরের দেখা মেয়েটাকে পছন্দ করেছে। সবাই ঘটকের থেকে মেয়েটার ছবি দেখছে, আবিরের বিছানার উপর ওর ছোটবোন মেয়েটার একটা ছবি রেখে গেছে।
আবির খুশিমনে ছবিটা দেখতেই অবাক হয়ে গেল,এটাতো রিনি নয়!!!
(চলবে)
লেখা ঃ আয়শা আক্তার জলি
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন