গল্প: "শেষ প্রহরে বৃষ্টি"(২য় পর্ব)
লেখা- সূর্যস্পশ্যা তনয়া
স্যারের বাসায় যেতে যেতে লিপিকা বলল,স্যার ওর থেকে আমার নাম্বার নিয়েছে।
স্যারের বাসা কাছে হওয়ায় আমরা খুব তাড়াতাড়িই পৌছে গেলাম।
কলিং বেল টিপতেই একজন মধ্য বয়স্কা মহিলা দরজা খুলে দিলেন।আমরা সালাম দিয়ে ভিতরে গেলাম।দেখি স্যার সাহিলের মাথায় পানি দিচ্ছে।
আমি সাহিলের পাশে বসে ওর হাতটা আমার হাতের মধ্যে নিলাম।কানে কানে বললাম,মিরাকুলাস লেডি চলে এসছে....
সাহিল হালকা করে চোখটা খুলে আমার কোলে ঝাপ দিলো।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরে থাকলাম।
- আমার স্পাইডার ম্যানটা কি খাবে?
- না,আমি খাব না।
- তাহলে কিন্তু আমি চলে যাব।
ও খেতে রাজি হইলো...
সাহিলকে খাইয়ে,ঔষধ খাইয়ে দিলাম।
জ্বর কমে গেলো।
কোলে নিয়ে হেটে হেটে ঘুম পাড়ালাম।স্যারের ক্লাস থাকায় উনি কলেজে চলে গেলেন।
বিকেলের দিকে সাহিলকে অনেকটা সুস্থ মনে হলো।তাই আমরা বাসায় চলে আসলাম।কিন্তু সাহিল তো ছাড়তেই চাইছিলো না,ওকে কথা দিলাম প্রতিদিন আসবো।
এভাবে কয়েকদিন আমি যাওয়া আসা করতাম।মধ্য বয়স্কা মহিলা সম্পর্কে স্যারের খালা।
একদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে দেখি সবার মুখ কেমন থমে থমে।
আমি রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে,এমন সময় আম্মু আসলেন।
- কিছু বলবা?
- হুম,তোর স্যারের খালা এসছিলো।
- সাহিল কে নিয়ে?
- হুম,একটা কথা বলতে।
- কি কথা আম্মু?
- যেই কথা বলেছে,তা শুনার আগে আমার মরণ হওয়া ভালো ছিলো।
- মানে কি? কি বলেছেন উনি?
- তোর সাথে এক ছেলের বাপের বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিছে।
- কিহহহ?
- হ্যা,আর তোর বাপও রাজি হইছে।সরকারী চাকরী বলে তোর বাপ সম্বন্ধ টা হাতছাড়া করতে চাইনি।
(দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লাম).....এক ছেলের বাপকে বিয়ে করতে আমার কোনো অসুবিধা নাই,আর সে যদি হয় সাহিলের জন্য। কিন্তু স্যার যদি আমাদের কলেজের প্রফেসর না হতেন.... স্যারকে স্বামী হিসেবে মেনে নেওয়া তো অসম্ভব।বয়সের ডিফারেন্স হবে অনেক,মনের মিল হবে না।
লোকে হাসবে..নাহ আর ভাবতে পারছি না।
আম্মু মেজাজ দেখাতে দেখাতে চলে গেলো।
রাতে আব্বু আমার রুমে আসলেন,
- সুহা মা,ঘুমিয়ে গেছিস?
- না,আব্বু।আসো ভিতরে।
- এতক্ষণে হয়তো তুই সব শুনেছিস।
আর তোর আব্বুকে অনেক লোভী আর খারাপ ভাবছিস,অবশ্য তোর মাও এগুলায় বলতেছে আমায়।
- না আব্বু।আমি একবারো এমনটা ভাবিনি।তুমি যেহেতু রাজি হইছো,আমার বিশ্বাস এর পিছনে তোমার কোনো সৎ উদ্দেশ্য আছে।
- এই না হলে আমার মেয়ে।আসলে আমিও প্রথমে শুনে মেজাজ খারাপ হয়েছিলো,কিন্তু পরে বাচ্চাটার কথা ভেবে রাজি হইছি।অতোটুকুন বাচ্চা মা ছাড়া,তাছাড়া সৈকতও কলেজে ব্যস্ত থাকে।ওর জীবনটাও তো অগোছালো।এতো কম বয়সে জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে ছেলেটার।আমি জানি তুই ই পারবি ওদের সংসারটাকে সাজিয়ে দিতে।
দেখ মা,জীবনটা তো খুবই ছোট,অনিশ্চিত। তবু এই জীবনে অনেক ভালো কিছু করার থাকে।রাজি হয়ে যা মা..
- দোয়া করো আব্বু।আমি যেন সফল হতে পারি।
আব্বু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন।
আমি ইস্তেখারা সালাত পড়ে,আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম,আমার জন্য যেটা কল্যাণকর হবে সেটাই যেন হয়।
পরদিন স্যার আসলেন আমাদের বাড়ি।আমি তো ভয়ে শেষ।
উনি আমার সাথে কথা বলার জন্য এসছেন।
আম্মু ছোট ভাইকে আমার রুমে রেখে চলে গেলেন।
- আপনার কি মাথা খারাপ হইছে?বিয়েতে রাজি হইছেন কেন?
- সাহিলের জন্য।
- সেটাই তো বলছি,সাহিলের জন্য কেন আপনার লাইফ,কেরিয়ার এভাবে নষ্ট করবেন।আমি তো আছি ওর জন্য। আর কাউকে দরকার নাই।
- তাহলে সেদিন ফোন দিয়ে কেন ডেকেছিলেন আমাকে?
- দেখেন,আবেগ আর বাস্তবতা অনেক আলাদা।আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে পরে পস্তাতে হয়।
- জানি আমি।
- আমার স্ত্রী হওয়ার মত কি যোগ্যতা আছে আপনার? পড়েন তো মাত্র ইন্টারে।আমার হাটুর বয়সী মেয়ে আপনি।
- আপনার স্ত্রী হওয়ার কোনো ইচ্ছে নাই আমার,আমি শুধু সাহিলের মা হবো।
- এতো সহজ না সবকিছু।
- সহজ করে নিবো ইং শা আল্লাহ
- উফ,কেন বুঝছেন না।এটা সম্ভব না।
- আল্লাহ চাইলে সবকিছুই সম্ভব।
- ওকে, যা মন চায় করেন।বলে হন হন করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
আম্মু বাহির থেকে সব শুনে ওনার প্রতি মায়া জন্মালো।তাই না খাইয়ে যেতে দিলেন না।
কিছুদিনের মধ্যে খুব সাদাবাটা ভাবে বিয়ে হয়ে গেলো আমাদের। কারো মাঝে কোনো আনন্দ না থাকলেও সাহিলের খুশিটা দেখার মত ছিলো।
বিয়ের দিন রাতে সাহিলকে ঘুম পাড়িয়ে ওর পাশে শুয়ে আছি,এমন সময়,স্যার আসলেন।
- ঘুমিয়েছে?
- জী,
- টেবিলে খাবার রাখা আছে,খেয়ে ঘুমিয়ে যান।পাশের রুমে আপনার শোবার ব্যবস্থা করা আছে।
এমনভাবে বলতেছে যেন আমি এক বিছানায় ওনার সাথে ঘুমানোর জন্য নাচছি।
যত্তসব/
- আপনি খাবেন না?
- আমাকে নিয়ে আপনার না ভাবলেও চলবে।
খালি অপমান করে আর কিচ্ছু জিগ্যেস করব না ধুরর।
আমি খেয়ে,সবকিছু গুছিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
শুয়ে শুয়ে ভাবছি,স্যারের সাথে বিয়ে হইছে আমার। এটা ভাবতেই হাসি পাচ্ছে অনেক।
বুইড়া ব্যাটা নিজেকে যে কি ভাবে,আল্লাহ জানে।
ফজরের আজানে ঘুম ভাঙলো ভোরে।
আমি স্যারকে ডাকার জন্য রুমে নক করলাম।উনি দরজা খুলে চোখ ডলতে ডলতে বললেন,
- কি হইছে?
- আজান দিলো,নামাজ পড়তে যাবেন না?
- কিহহ,আজান হয়ে গেছে?
- জী,
- ওহ,জানেন আজ প্রায় সাড়ে তিনবছর পর মনে হয় আমি রাতে ফুল টাইম ঘুমিয়েছি।সাহিল রাতে কান্না করে।কিন্তু আজকে তো টু শব্দও করেনি।
তাই বুঝতে পারিনি।
- এখন থেকে আপনি প্রতিদিন জামায়াতের সাথে নামাজ পরবেন।দেরী হচ্ছে..
উনি নামাজে চলে গেলেন,আমিও নামাজ পড়ে নিলাম।
নামাজ পড়ে সাহিলের পাশে বসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
শুনতে পেলাম রান্নাঘরে থালাবাটি ধোয়ার শব্দ।আমি দৌড়ে রান্নাঘরে গেলাম।দেখি উনি বাসী থালা বাসন ধুচ্ছেন।
- একি,আপনি কেন এসব করছেন?
- কেন,রোজই তো করি।
- হুম,কিন্তু এখন থেকে আমি করব।
- জী নাহ।আপনার কাজ শুধু সাহিলকে দেখাশোনা করা।আপনি ওর দিকে খেয়াল রাখেন তাহলেই আমার প্রতি বড় এহসান করা হবে।আর আপনার পড়ালেখার যেন কোনো ক্ষতি না হয়,সেদিকেও খেয়াল রাখবেন।
- তা তো অবশ্যই।কিন্তু আমি যদি সাংসারিক কাজ না করি সংসারটাকে আপন মনে হবে কিভাবে।
- প্রয়োজন মনে করছিনা।যতটুকু বলছি ঠিক ততটুকু করবেন।
উফ আবারো অপমান,নাহ এই বুইড়া ব্যাটাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
- মাম্মাম....(সাহিল ঘর থেকে ডাকছে)
- আসছি বাবা( আমি ঘরে ছুটে গেলাম)
- বাবু তুমি আমাকে আম্মু বলবা কেমন।
- আল পাপাকে?
- পাপাকে আব্বু বলবা।
- ওকে দান।
স্যার সাহিলের জন্য নুডুলস বানিয়ে নিয়ে রুমে আসলেন।
- আব্বু...
স্যার অবাক হয়ে গেলেন।
- হুম বলো আব্বু (কপালে একটা চুমু দিয়ে)
- আম্মুকেও একটা পাপ্পি দাও...
সাহিলের কথায় আমি লজ্জা পেয়ে রুম থেকে চলে গেলাম।
রান্নাঘরে যেয়ে দেখি উনি খিচুড়ি বসিয়েছেন।বাব্বাহ পারেও বটে।
এভাবে মান অভিমানে দিনকাল ভালোই চলছিলো তিনজনের সংসারে।
একদিন সাংসারিক টুকিটাকি জিনিশ কিনতে উনি আমাকে আর সাহিলকে শপিংমলে নিয়ে গেলেন।
আমি সাহিলকে খেলনা কিনে দিচ্ছিলাম,দূরে দেখলাম স্যার একটা মেয়ের সাথে কথা বলছে।
কথার মাঝে ইশারা করে আমাদের দিকে দেখালেন।মেয়েটা এক পলক তাকিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলো,আমি কিছুই বুঝলাম না।
চলবে.....
বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন, ২০১৯
শেষ প্রহরে বৃষ্টি
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন