অসমাপ্ত ভালবাসা(পর্ব-২)
(শেষ পর্ব)
রিনির পরিবির্তে অন্য একটা মেয়ের ছবি দেখে আবির প্রথমে চমকে গেলেও পরে বুঝতে পারে যে, নিশ্চয়ই ঘটক ব্যাটা ভুল করে ফেলেছে, রিনির সাথে কথা না বলে অন্য একটা মেয়ের সাথে কথা বলেছে। কিন্তু রিনিতো বলল যে,ঘটক নাকি সেদিন ওর সাথেও কথা বলেছে! তাহলে ঝামেলাটা কোথায়!!
আবির কিছু বুঝতে না পেরে আবার রিনিকে কল করল...
_হ্যা আবির বলো, কি খবর?
_কি খবর মানে! সেদিন কি ঘটক সত্যি তোমার সাথে কথা বলেছিল?
_হ্যা। আমার সাথে কথা বলেছিল। কেন?
_আর বলোনা,সেদিন আমি তোমাকে দেখিয়ে দিলাম,অথচ আমার পরিবারের কাছে আরেকটা মেয়ের ছবি নিয়ে এসেছে, এখানেতো তোমার ছবি থাকার কথা।
_কি বলছ এসব? আমিতো ওই লোকটাকে আমাদের বাসাতেও দেখেছি। অন্যমেয়ের ছবি! মানে কি!
_নইলে আমি কি মিথ্যা বলছি নাকি।
_ওহ হ্যা,মনে পড়েছে, সেদিন ঘটক আমার সাথে কথা বলার আগে আরেকটা মেয়ের সাথেও কথা বলেছিল। তারমানে...
_বলছ কি এসব?
_হুম। আচ্ছা তুমি ওই মেয়ের একটা ছবি দাওতো।
আবির মেয়েটার ছবি থেকে ফোনে একটা ছবি তুলে রিনিকে পাঠাতেই রিনি অবাক হয়ে গেল, এইটাই সেই মেয়েটা।
আবির রাগে গজগজ করতে করতে ঘটকের কাছে গেল..
_আরে আপনাকে দেখালাম একটা মেয়েকে, আর আপনি আরেকটা মেয়ের ছবি এনে হাজির করেছেন!
_ওহ! আসলে সেদিন ওখানে কমলা রঙের ড্রেস পড়া দুইটা মেয়ে ছিল৷ আমি দুই মেয়েরই খোজ খবর নিয়েছি। আরেকটা মেয়ে যে ছিল, ওর নাকি বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। তাই ভাবলাম এই মেয়েই হবে হয়ত। আর মেয়েটা দেখতেও অনেক সুন্দর।
তারপর ঘটককে আর কিছু না বলে রিনিকে জানায় যে, ওর বাবা নাকি ঘটককে বলেছে যে ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
রিনি জানে যে ওর বাবা হয়ত নিজের পছন্দমতো কোনো বিয়ে ঠিক করে রেখেছে, আর ওর ভাই আসলে ওর নিজেরও কিছু করার থাকবে না, যেখানে বিয়ে দিবে সেখানেই বিয়ে করতে হবে। আর আবিরের পরিবার এখনি ওকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে।
আবির ওর পরিবারে রিনির কথা জানাতে চাইলেও রিনি বারণ করে, কারণ এখন ও ওর বাবাকে বিয়ের কথা বলতে পারবে না। তাই ওরা অনেক বড় একটা কাজ করে ফেলে।
আবিরের কিছু বন্ধুর সাথে গিয়ে রিনিকে বিয়ে করে ফেলে। ওদিকে আবিরের পরিবার ওই মেয়েটা মানে ইমির পরিবারের সাথে কথা বলার জন্য গ্রামে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে থাকে।
আবিরদের গ্রাম আর ইমিদের গ্রাম পাশাপাশি। তাই আবির ভাবে মেয়ে দেখার ছলে গ্রাম থেকেও ঘুরে আসা যাবে, আর মেয়ে দেখার পর কোনো একটা দোষ দেখিয়ে বিয়েটা ভেঙে দেওয়া যাবে।
আবির সকালে ঘুম থেকে না উঠতেই ফোনের আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায়, এতো সকালে রিনির ফোন পেয়ে চমক উঠে। তাড়াতাড়ি ফোন রিসিভ করতেই রিনি কাপাকাপা গলায় বলতে থাকে..
_আবির, আজ নাকি আমাদের বাসায় কিছু লোক আসবে, বাবা বলেছে তারা নাকি তার অফিসের লোক, কিন্তু আমি সিউর এরা আমাকে দেখতে আসবে। মা আর বাবার হাবভাবে তাই বোঝা যাচ্ছে।
_আচ্ছা ভয়ের কিছু নেই, আমরা কাল গ্রামে যাচ্ছি, আমি পরশুই চলে আসব, অফিস আছে, আর সবাই কয়দিন থাকবে।
_আচ্ছা, যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। ভাইয়া আসার আগেই আমার বাবা-মাকে ম্যানেজ করতে হবে।
_আচ্ছা তোমার ভাইয়াকে বললে কেমন হয়?
_ঠিক বলেছ, ভাইয়া কখনো আমার কথা ফেলতে পারবে না।
_আচ্ছা, চিন্তা করোনা। দেখ সব ঠিক হয়ে যাবে।
_হুম। তুমিও ভালভাবে যেও, নিজের খেয়াল রেখ আর...
_কি??
_অন্যকোনো মেয়ের দিকে নজর দিবেনা একদম। এখন তুমি আমার বর।
_ওকে সোনাবউ। যথাজ্ঞা।
_বাই।
_হুম।
রাতে রিনির ভাই কল করলে ওর মা ওকে ফোন দেয় কথা বলার জন্য, রিনি ফোন নিয়ে সোজা ওর রুমে চলে আসে। কিছুক্ষণ কথা বলার পর রিনি জানায় ও একটা কথা বলবে। ওর ভাই স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায় যে ও কি বলবে। ও ভয়ে ভয়েই আবিরের কথাটা বলে ফেলে...
_ভাইয়া আমি একজনকে ভালবাসি।
কথাটা শুনে ওর ভাই একটুও অবাক হয়না,উনার কাছে এটাই যেন স্বাভাবিক, এ যুগের মেয়ে কাউকে ভালো লাগতেই পারে। তাই হাসিমুখেই সে উত্তর দেয়..
_বাহ! আমার ছোট্ট বোনটা বড় হয়ে গেছে। পছন্দ করা শিখে গেছে। তা ছেলে কি করে?
রিনি তখন আবিরের সবকিছু ওর ভাইকে খুলে বলে,আবিরের ছবি দেয়, ওর ভাইয়েরও খুব পছন্দ হয় আবরকে।
রিনি নির্ভয়ে আবিরকে সব জানায়। আবির অনিচ্ছাসত্ত্বেও এইবার গ্রামে যাচ্ছে। রিনিকে রেখে ওর গ্রামে যেতে মন চাচ্ছেনা। তার উপর রিনিকে আজ কয়দিন দেখেনি, ভালই লাগছেনা।
গ্রামে পৌছাতে পৌছাতে অনেকটাই রাত হয়ে যায়। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করেই শুয়ে পড়ে আবির।
গ্রামে ওর দুই চাচা থাকে, ওরা আসলে ওর ছোট চাচার ওখানেই বেশি থাকে। ঘুমানোর আগে রিনির সাথে একটু কথা বলে নেয়। তারপর শোয়ার একটু পরেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় আবির।
আবিরের সাথে কথা বলার একটু পরেই আবিরের বন্ধু নীল রিনিকে ফোন করে। এতো রাতে নীলের ফোন পেয়ে কিছুটা চমকে যায় রিনি। ফোন ধরবে কি ধরবে না বুঝতে পারেনা। তারপর ফোন ধরতেই নীল যা জানায় তা শুনে গলা শুকিয়ে যায় রিনির।
আবিরকে নাকি গ্রামে ওই মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে নিয়ে গেছে। ওর পরিবারের সবার ধারণা মেয়েটাকে আবির অনেক পছন্দ করে, তাই আবিরকে সারপ্রাইজ দিতেই ওকে না জানিয়ে বিয়ের প্লান করেছে।
কথাটা বলার জন্য রিনি আবিরকে কল করতে থাকে, কিন্তু আবির ফোন রিসিভ করেনা, কারণ ওতো ঘুমে বিভোর।
সকালে রিনির এতবার কল করা দেখে আবির সাথেসাথেই কলব্যাক করে।
_কি ব্যাপার রিনি কি হয়েছে?
রিনি কাদোকাদো কন্ঠে আবিরকে সব জানায়। আবির সব শুনে যেন থ হয়ে যায়। রিনিকে শান্তনা দিয়ে বলে...
_চিন্তা করোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তোমার ভাইতো রাজিই আছে। গ্রাম থেকে এসেই আমি আমার বাবাকে তোমার বাসায় পাঠিয়ে সব সত্যিটা জানিয়ে দেব।
_আর আজ? তোমার বাবা-মাকে কি বলবে? সব সত্যিটা বলতে পারবে?
_হুম। বলতেতো হবেই।
_আচ্ছা। যা ভালো হয় করো।
_আচ্ছা।
আবির ফোন রাখলেও তার বাবাকে কি করে রিনির কথা বলবে ভেবে পায়না। দোষটাতো ওর নিজেরই, পছন্দ থাকার পরেও বলছে কোনো পছন্দ নেই, এইবারতো সত্যিটা বলতেই হবে!
ওদিকে রিনি চিন্তা করতে করতে অস্থির হয়ে যায়, আবির বলতে পারবেতো ওদের বিয়ের কথা, নাকি ভয়ে কিছু না বলে ওই মেয়েটাকেও বিয়ে করে নিবে! আবিরের উপর আর ভরসা করতে পারেনা।তাই ওর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার নাম করে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ওর উদ্দেশ্য আবিরদের গ্রাম।
আবির সকালে নাস্তা শেষে ওর বাবাকে রিনির কথাটা জানায়।উনারা ভালভাবেই ব্যাপারটা মেনে নেয়, বরং উনাদের না জানিয়ে বিয়ে করেছে শুনে আবিরকে খুব বকা দেয় ওর বাবা।
সব ঠিকঠাক!
আবিরের আনন্দ আর দেখে কে! শহরে ফিরেই রিনিদের বাসায় যাবে ওর বাবা! এই সংবাদটাতো রিনিকে দিতেই হবে!
রিনিকে ফোন করতেই একটা পুরুষ কন্ঠ ভেসে আসে। আবির খুব চমকে যায়!
_কে? কে বলছেন?রিনি কই?
_দেখেন আপনি উনার কি হন?
_আমি.... আমি উনার স্বামী। কি হয়েছে রিনির?
_দেখুন নিজেকে শক্ত করুন, একটা ট্রাকের সাথে ধাক্কায় উনি ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন।
কথাটা শুনার জন্য আবির একটুও প্রস্তুত ছিলনা। মনে হচ্ছে কেউ ওর কলিজাটা টেনে বের করে নিচ্ছে। চোখ দিয়ে যেন একফোঁটা জলও আসছে না। ও লোকটাকে ধমক দিয়ে বলে...
_কি আবোলতাবোল বলছেন! দেখেন আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে! ওটা হয়ত অন্যকেউ!
_আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি, কিন্তু সত্যিটাতো মেনে নিতেই হবে!
কথাটা যেন তখনো মেনে নিতে পারছিল না আবির। কিন্তু শহরে ফিরে রিনিকে যেন চিনতে পারছিল না আবির। মুখের একপাশে থেতলে গেছে। সাথে থেতলে গেছে আবির আর রিনির দেখা স্বপ্নগুলো! যা কখনো পুরণ হবেনা! থেকে যাবে অপুর্ণ!
(সমাপ্ত)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন