শানুর মুখে মামার নাম শুনে তার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলাম। সে আমার বড় মামার মেয়ে। নানা নানীর আদর একাই পেয়েছে। আর আমি তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেছি। আশা নিয়ে আছি, হয়তো একদিন তাদের ভালোবাসা আমিও পাব।
আমাকে বাড়ির বাইরে দাড় করিয়ে শানু ভিতরে গেল। একটি মেয়ে হুট করেই কোনো ছেলেকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যেতে পারেনা। বাড়ির ভিতরের পরিবেশ সামাল দিতেই হয়তো আমাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু যখন দেখলাম শানু সাথে করে তার চাচাত ভাই বশিরকে নিয়ে এল তখন আমার কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থা। এমনিতেই বশির আমাকে দেখতে পারেনা আর আজ বাড়ি এসে উপস্থিত। তার গালের কাটা দাগ দেখলে আরো ভয় করে। আবার মনে হলো, শানুর চাচাত ভাই হলে নিশ্চয় বশির শামীম মামার ছেলে। বশির আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগে শানু বলল,
-বশির, তুই দাদুকে বলবি শ্রাবণ তোর বন্ধু। তোর কাছে এসেছে।
বশির আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে কিড়মিড় করে মুখে হাসির আভা দেখিয়ে বলল,
-আয় শ্রাবণ, ভিতরে আয়।
কাঠের চেয়ারটিতে যে বয়ষ্ক মানুষটি বসা তিনি হয়তো আমার নানা। পাশেই জলচৌকিতে হয়তো নানী। পান সাজিয়ে দিচ্ছেন। তাদের দেখিয়ে শানু বলল, শ্রাবণ আমার দাদা আর দাদী।
আমার চোখ ছলছল করছে। সালাম দিয়ে ধীরে কাছে এগিয়ে গেলাম। নানী জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো?
আমার চোখ তবুও ছলছল করছে। মনে হচ্ছে কেঁদেই দেব। নিজেকে সামলে রেখে বললাম,
-আমি ভালো আছি, নানী আপনি কেমন আছেন?
আমার কাছে হয়তো দাদী ডাক আশা করেছিল। আমি নানী ডাকায় সবাই একে অন্যের দিকে তাকাল। এবারে নানী বসা থেকে উঠে আসল। নানীর চোখও ছলছল। আমার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইলেন,
-আমি শানুর দাদী, তুমি নানী ডাকলে কেন?
মাটির দিকে তাকাতেই দুই ফোটা পানি পড়ল চোখ থেকে।
-আমার নানী নেইতো, তাই নানী ডাকলাম।
নানীও আঁচলে চোখ মুছল। নানা পাশ থেকে বলছে, কী শুরু করলা? ছেলেটি আসছে, তাকে বসতে দাও। খেতে দাও আগে, তারপর কথা বলিও।
আমি হাতমুখ ধুইতে নলকূপে গেলাম শানুর সাথে। তখন চোখে মুখে বেশি করে পানি দিলাম। খুব ইচ্ছে করছে একটু কাঁদি। ইচ্ছে করছে মা'কে ফোন করে বলি, মা আমি নানীর বাড়ি এসেছি। চব্বিশ বছর আগে তুমি যে বাড়ি ছেড়ে গেছো সে বাড়িতে আমি এসেছি মা। ফোন দেয়া হয়নি।
খাবার সাজিয়ে দিলেন বড় মামি। দুই মামার এক মামাও বাড়ি নেই। দুপুর দেড়টা বাজে। তাদের এতক্ষনে আসার কথা। শানু বলছে,
-শ্রাবণ, এই মাছে ফরমালিন নেই। বেশি করে খা। সারাজীবনতো বরফ দেয়া মাছ খেয়েছিস।
শানুর কথায় আমার মন নেই। আমি ভাবছি দাদার বাড়ির দাদা দাদীও কি এমন করে আদর করবে আমাকে?
বিকেলে আমাকে নিয়ে শানু বের হলো। উদ্দেশ্য, অপুর সাথে দেখা করা। আমার সামনেই অপুকে ফোন দিচ্ছে শানু। তার রাগ দেখে বুঝা যাচ্ছে, অপু ফোন রিসিভ না করে বারবার কেটে দিচ্ছে। যেই একবার ফোন রিসিভ করল তখনই শানু এক নিঃশ্বাসে শুরু করল,
-এই তুই ফোন কাটোস কেন বারবার? আমার ফোন দেখিসনি তুই? কোথায় তুই? বের হয়ে আয়, এখন বের হবি তুই।
আমার মনে পড়ে গেল, শানু সেদিন আমার শার্টের কলার চেপে ধরেছিল। এখন অপুর সাথে ফোনে যেভাবে কথা বলল, তাতে বুঝাই যাচ্ছে অপুও প্রেম করে মহা ঝামেলায় আছে। শানু বলল এরই মধ্যে নাকি ওদের দুই পরিবারের মানুষ জেনে গেছে এই সম্পর্কের কথা। তাইতো কলেজে পরশুদিন শানুকে মন খারাপের কারণ জানতে চাওয়ায় বলেছিল অপুর কথা মনে পড়েছে। আমাকে বলেছিল আমি যেন কিছু একটা করি। অপুর সাথে দেখা করানোর কথা রয়েছে। কিন্তু অপু আসবে বলে মনে হয়না। আবার আরেক মন বলছে শানু যেভাবে শাসিয়েছে, যেখানেই থাকুক দ্রুত চলে আসবে।
অপু আর আসেনি। সে নাকি মেথিকান্দা রেলস্টেশনের কাছে। আসতে আরো সময় লাগবে।
সন্ধার একটু আগে বাবা ফোন দিয়ে জানতে চেয়েছে আমি কোথায়? বাড়ি যাইনি কেন কলেজ থেকে?
আমি হুট করে বলে ফেলেছি,
-বাবা আমি নানীর বাড়িতে, চিন্তা করোনা। রাতে থাকতে হতে পারে, কাল আসব।
-ফাইজলামি করোস? নানীর বাড়ি মানে?
ভাবতে লাগলাম, এখনই সব বলা ঠিক হবেনা। পরে অবস্থা বুঝে সব বলা যাবে। কথা ঘুরিয়ে বাবাকে বললাম,
-আমি দাসপাড়া রিয়াদের বাড়িতে। কাল সকালে এখান থেকেই কলেজ যাব।
সন্ধার পর দেখা মিলল দুই মামার সাথেই। এক মামা সন্ধায় আবার বাজারে ছুটলেন। বললেন, দুপুরে বাড়ি ছিলামনা। কি দিয়ে না জানি খেয়েছো বাবা। আমি যাব আর আসব।
পুকুরপাড়ে গাছের গুড়ি রাখা, বসে পড়লাম সেখানে। কানে হেডফোন গুজে দিয়ে গান শুনছে শানু। আমার বিরক্ত লাগছে তার এমন আচরণে। তবে তার মাথা ঈষৎ নাড়ানো দেখে ভালো লাগছে। চেহারায় কোনো মায়া মায়া ভাব নেই। ওর তো মায়াই নেই, যে ব্যবহার। কী দেখে যে ভালো লেগেছিল জানিনা। এখন কত শান্ত লাগছে। অপুও এই গ্রামের। আমি দূর থেকে এসে শানুকে নিয়ে যাব এটা মেনে নিবেনা সে। অপুকে দরকার ছিল, কথা বলার জন্য। দুই পরিবারের মধ্যে তাদের নিয়ে কী কথা হয়েছে বা কোনো ঝগড়া হয়েছে কিনা আমি জানিনা। শানুর কান থেকে হেডফোন খোললাম।
-মামা জানে তোদের ব্যাপারটা?
-কোন মামা?
- আরে তোর বাবা জানে নাকি অপুর কথা?
-জানে মানে? অপুকে রাস্তায় দাড় করিয়ে বলে দিয়েছে যে, বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে দেখলে হাত পা ভেঙ্গে দেবে।
-তো বাড়ির আশেপাশে আসে কেন? তুই লেখাপড়া করিস আমাদের সদরে। সেখানে গিয়ে দেখা করলে কী হয়?
-সে তাদের চাউলের আড়তে বসে। আসার পথে আর যাবার পথে দেখা করার জন্য উঁকি ঝুকি দেয়।
-বুঝলাম। তো তোদের মধ্যে প্রেম হলো কী করে?
-এখন আমি বাড়িতে বসে তোকে প্রেম কাহিনী বলব?
-ওকে ওকে ঠিক আছে। এটা শুধু বল অপুদের বাড়ির কেউ জানে কিনা।
-জানেনা বলেইতো এখনো সাহস দেখাতে পারছি। বাবাতো জানে অপুই বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করে। আমিও যে ডুবে ডুবে শালুক তুলি সেটা এখনো জানেনা।
-তোর সাথে আর কথাই নাই। তুইনা বললি তোর পরিবার জেনে গেছে? তুই বিপদে আছিস, চিন্তায় আছিস। তোকে সাহায্য করতে হবে। সব মিথ্যে বললি আমাকে?
-আরে মিথ্যে বলব কেন? বাবা জানেনা তো কী হয়েছে? দাদীর কাছে বলেছিলাম। দাদী বলে দিছে দাদার কাছে। দাদা রাগ দেখিয়ে চিল্লাচিল্লি করে বলেছে, আমার মেয়েকে ২৪ বছর ধরে মেনে নেইনি এই বাড়ির সম্পর্কের জন্য। আবারো যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় তাহলে কারো রক্ষা নেই।
ভাগ্যিস বাবা তখন বাড়ি ছিলনা। মা গিয়ে দাদাকে বলেছে, বাবা আমি শাসন করব। আপনি আর বলিয়েননা এসব, মানুষ মন্দ বলবে।
রাতে আমার স্থান হলো বশিরের সাথে। ভাবছি ঘুমের মধ্যে আমাকে মেরে বসবেনাতো? সকালে শানুর সাথেই কলেজে যাব। বশির সাথে না গেলেই হয়। খন্দকার বাড়ির সাথে এত বিরোধ অথচ বশির অপুকে মেনে নেয় আমাকে মেনে নেয়না। আবার ভাবছি অপু খন্দকার বাড়ির হলে আমি কোন বাড়ির? মনে পড়তেই ঠোটের কোণে হাসির রেখা।
সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসলাম। আসতে দেয়নি। আরেকবার তিন চারদিনের জন্য যাব তেমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারপর আসতে হলো। কলেজে থেকেই বাবাকে ফোন দিলাম। বললাম একজন মেহমান আসবে আমার সাথে, তিনি যেন ভালো বাজার করেন। বাবা মা'কে ফোন ধরিয়ে দিলেন।
-কয়জন আসবে মেহমান?
-একজনই মা। তুমি রান্না করো।
-কী রান্না করতে হবে?
-ধরো তোমার পুত্রবধূর জন্য তুমি রান্না করবে। এখন কী কী রাধবে সেটা তুমি ভেবে নাও।
-যদি পুত্রবধূই আসে তাহলে আমি খাটে পা তুলে বসে থাকব। তোর বাবা বাজার করতে গেছে, তোর বউ আসলে রান্না করে আমাকে খাওয়াবে।
ফোন রেখে দিলাম। মায়ের সাথে কথায় পারবনা। তবে আজ মা'কে একটু চমকে দেব।
বারোটার দিকে আমি আর শানু আমাদের বাড়ির কাছাকাছি। সে আসতে চায়নি, তাকেও বলেছি একটা চমক দেব। নয়াচরে নানা নানীকে পরিচয় দেইনি, কারণ বাবা মা'কে তারা আজও মেনে নেয়নি। দেখা গেল পরিচয় দিলে বাড়িতেই ঢুকতে দিবেনা।
এখন পরিচয় দিলে সমস্যা হবেনা আশা করি। বাবা মা শানুকে দেখে কিছুটা চমকে গেছে। আমি কোনোদিন আমার মেয়ে বন্ধু বাড়িতে আনিনি। মা'কে ফোনে বলেছি চমকে দেব। শানুকে দেখে যে চমক পেয়েছে মা মনে করেছে এতটুকুই শেষ। আমি বললাম,
-মা ওর নাম শানু, দেখোতো ওর চেহারায় কারো মিল খোঁজে পাও নাকি?
মা আমার দিকে তাকিয়ে আবার শানুর দিকে তাকাল। বাবাও কিছু বুঝতে পারেনি। আমি আবার বললাম,
-মা তোমাকে না বললে চিনবেনা। সে তোমার ভাইয়ের মেয়ে। আল-আমিন মামার মেয়ে।
মা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, কিযে বলিসনা তুই। সবসময় ফাইজলামি।
আমি যখন মা'কে বলেছি মা সে আল-আমিন মামার মেয়ে। তখন শানু পুরোই হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবা বলল, শ্রাবণ আগে ঘরে নিয়ে আয় মেয়েটাকে। তারপর সত্যি করে বল কে।
আমি বললাম,
-আমি গতকাল বাবাকে ফোন করে বলেছিলাম আমি নানীর বাড়ি। বাবা বিশ্বাস করেনি তাই বলেছি রিয়াদদের বাড়ি। আমি গতকালই প্রথম শানুর সাথে নয়াচরে যাই। শানু সরকার বাড়ির মেয়ে। আমার সাথে কলেজে পড়ে।
মা আমার কথা শুনে শানুর দিকে এগিয়ে এল। বাবা আমাকে বলছে, খন্দকার বাড়ি গিয়েছিলি?
আমি বললাম না বাবা। তবে খন্দকার বাড়ি দেখেছি, ভিতরে যাইনি।
বাবা আবারো বলল, তোর দাদাকে দেখিসনি? ঐযে ছবিতে দেখিয়েছি।
বাবার চোখ ছলছল, আমি বললাম না বাবা দেখিনি। শানুকে মা কাছে টেনে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, আমাকে তুমি চিনবেনা। আমাকে কখনো দেখোনি তুমি। আমি তোমার ফুফু।
শানু আমাকে বলল, শ্রাবণ আমি কিছু বুঝতে পারছিনা।
আমি বললাম, এই তোমার সেই ফুফু। যার কথা তোমার দাদা বলেছিল।
মা সাথে সাথে জানতে চাইল, বাবা আমার কথা কী বলেছে? বলনা কী বলেছে?
আমি বললাম মা সবই বলব। তোমার ভাইজিকে খেতে দিবাতো আগে নাকি?
চোখ মুছতে মুছতে মা শানুকে নিয়ে ঘরে গেলেন। বাবাও চোখ মুছলেন। দাদার বাড়ির কথা শুনতেই জিজ্ঞেস করেছিল দাদাকে দেখেছি কিনা। সেই সাদাকালো ছবির লোকটি।
.
(........চলবে)
.
লেখনীর শেষ প্রান্তে,,,,,,,
👉মোঃআসাদ রহমান
ঝিনাইদ,কোটচাঁদপুর
গল্পঃ দুই দুয়ারী
শানুর মুখে মামার নাম শুনে তার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলাম। সে আমার বড় মামার মেয়ে। নানা নানীর আদর একাই পেয়েছে। আর আমি তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেছি। আশা নিয়ে আছি, হয়তো একদিন তাদের ভালোবাসা আমিও পাব।
আমাকে বাড়ির বাইরে দাড় করিয়ে শানু ভিতরে গেল। একটি মেয়ে হুট করেই কোনো ছেলেকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যেতে পারেনা। বাড়ির ভিতরের পরিবেশ সামাল দিতেই হয়তো আমাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু যখন দেখলাম শানু সাথে করে তার চাচাত ভাই বশিরকে নিয়ে এল তখন আমার কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থা। এমনিতেই বশির আমাকে দেখতে পারেনা আর আজ বাড়ি এসে উপস্থিত। তার গালের কাটা দাগ দেখলে আরো ভয় করে। আবার মনে হলো, শানুর চাচাত ভাই হলে নিশ্চয় বশির শামীম মামার ছেলে। বশির আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগে শানু বলল,
-বশির, তুই দাদুকে বলবি শ্রাবণ তোর বন্ধু। তোর কাছে এসেছে।
বশির আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে কিড়মিড় করে মুখে হাসির আভা দেখিয়ে বলল,
-আয় শ্রাবণ, ভিতরে আয়।
কাঠের চেয়ারটিতে যে বয়ষ্ক মানুষটি বসা তিনি হয়তো আমার নানা। পাশেই জলচৌকিতে হয়তো নানী। পান সাজিয়ে দিচ্ছেন। তাদের দেখিয়ে শানু বলল, শ্রাবণ আমার দাদা আর দাদী।
আমার চোখ ছলছল করছে। সালাম দিয়ে ধীরে কাছে এগিয়ে গেলাম। নানী জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো?
আমার চোখ তবুও ছলছল করছে। মনে হচ্ছে কেঁদেই দেব। নিজেকে সামলে রেখে বললাম,
-আমি ভালো আছি, নানী আপনি কেমন আছেন?
আমার কাছে হয়তো দাদী ডাক আশা করেছিল। আমি নানী ডাকায় সবাই একে অন্যের দিকে তাকাল। এবারে নানী বসা থেকে উঠে আসল। নানীর চোখও ছলছল। আমার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইলেন,
-আমি শানুর দাদী, তুমি নানী ডাকলে কেন?
মাটির দিকে তাকাতেই দুই ফোটা পানি পড়ল চোখ থেকে।
-আমার নানী নেইতো, তাই নানী ডাকলাম।
নানীও আঁচলে চোখ মুছল। নানা পাশ থেকে বলছে, কী শুরু করলা? ছেলেটি আসছে, তাকে বসতে দাও। খেতে দাও আগে, তারপর কথা বলিও।
আমি হাতমুখ ধুইতে নলকূপে গেলাম শানুর সাথে। তখন চোখে মুখে বেশি করে পানি দিলাম। খুব ইচ্ছে করছে একটু কাঁদি। ইচ্ছে করছে মা'কে ফোন করে বলি, মা আমি নানীর বাড়ি এসেছি। চব্বিশ বছর আগে তুমি যে বাড়ি ছেড়ে গেছো সে বাড়িতে আমি এসেছি মা। ফোন দেয়া হয়নি।
খাবার সাজিয়ে দিলেন বড় মামি। দুই মামার এক মামাও বাড়ি নেই। দুপুর দেড়টা বাজে। তাদের এতক্ষনে আসার কথা। শানু বলছে,
-শ্রাবণ, এই মাছে ফরমালিন নেই। বেশি করে খা। সারাজীবনতো বরফ দেয়া মাছ খেয়েছিস।
শানুর কথায় আমার মন নেই। আমি ভাবছি দাদার বাড়ির দাদা দাদীও কি এমন করে আদর করবে আমাকে?
বিকেলে আমাকে নিয়ে শানু বের হলো। উদ্দেশ্য, অপুর সাথে দেখা করা। আমার সামনেই অপুকে ফোন দিচ্ছে শানু। তার রাগ দেখে বুঝা যাচ্ছে, অপু ফোন রিসিভ না করে বারবার কেটে দিচ্ছে। যেই একবার ফোন রিসিভ করল তখনই শানু এক নিঃশ্বাসে শুরু করল,
-এই তুই ফোন কাটোস কেন বারবার? আমার ফোন দেখিসনি তুই? কোথায় তুই? বের হয়ে আয়, এখন বের হবি তুই।
আমার মনে পড়ে গেল, শানু সেদিন আমার শার্টের কলার চেপে ধরেছিল। এখন অপুর সাথে ফোনে যেভাবে কথা বলল, তাতে বুঝাই যাচ্ছে অপুও প্রেম করে মহা ঝামেলায় আছে। শানু বলল এরই মধ্যে নাকি ওদের দুই পরিবারের মানুষ জেনে গেছে এই সম্পর্কের কথা। তাইতো কলেজে পরশুদিন শানুকে মন খারাপের কারণ জানতে চাওয়ায় বলেছিল অপুর কথা মনে পড়েছে। আমাকে বলেছিল আমি যেন কিছু একটা করি। অপুর সাথে দেখা করানোর কথা রয়েছে। কিন্তু অপু আসবে বলে মনে হয়না। আবার আরেক মন বলছে শানু যেভাবে শাসিয়েছে, যেখানেই থাকুক দ্রুত চলে আসবে।
অপু আর আসেনি। সে নাকি মেথিকান্দা রেলস্টেশনের কাছে। আসতে আরো সময় লাগবে।
সন্ধার একটু আগে বাবা ফোন দিয়ে জানতে চেয়েছে আমি কোথায়? বাড়ি যাইনি কেন কলেজ থেকে?
আমি হুট করে বলে ফেলেছি,
-বাবা আমি নানীর বাড়িতে, চিন্তা করোনা। রাতে থাকতে হতে পারে, কাল আসব।
-ফাইজলামি করোস? নানীর বাড়ি মানে?
ভাবতে লাগলাম, এখনই সব বলা ঠিক হবেনা। পরে অবস্থা বুঝে সব বলা যাবে। কথা ঘুরিয়ে বাবাকে বললাম,
-আমি দাসপাড়া রিয়াদের বাড়িতে। কাল সকালে এখান থেকেই কলেজ যাব।
সন্ধার পর দেখা মিলল দুই মামার সাথেই। এক মামা সন্ধায় আবার বাজারে ছুটলেন। বললেন, দুপুরে বাড়ি ছিলামনা। কি দিয়ে না জানি খেয়েছো বাবা। আমি যাব আর আসব।
পুকুরপাড়ে গাছের গুড়ি রাখা, বসে পড়লাম সেখানে। কানে হেডফোন গুজে দিয়ে গান শুনছে শানু। আমার বিরক্ত লাগছে তার এমন আচরণে। তবে তার মাথা ঈষৎ নাড়ানো দেখে ভালো লাগছে। চেহারায় কোনো মায়া মায়া ভাব নেই। ওর তো মায়াই নেই, যে ব্যবহার। কী দেখে যে ভালো লেগেছিল জানিনা। এখন কত শান্ত লাগছে। অপুও এই গ্রামের। আমি দূর থেকে এসে শানুকে নিয়ে যাব এটা মেনে নিবেনা সে। অপুকে দরকার ছিল, কথা বলার জন্য। দুই পরিবারের মধ্যে তাদের নিয়ে কী কথা হয়েছে বা কোনো ঝগড়া হয়েছে কিনা আমি জানিনা। শানুর কান থেকে হেডফোন খোললাম।
-মামা জানে তোদের ব্যাপারটা?
-কোন মামা?
- আরে তোর বাবা জানে নাকি অপুর কথা?
-জানে মানে? অপুকে রাস্তায় দাড় করিয়ে বলে দিয়েছে যে, বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে দেখলে হাত পা ভেঙ্গে দেবে।
-তো বাড়ির আশেপাশে আসে কেন? তুই লেখাপড়া করিস আমাদের সদরে। সেখানে গিয়ে দেখা করলে কী হয়?
-সে তাদের চাউলের আড়তে বসে। আসার পথে আর যাবার পথে দেখা করার জন্য উঁকি ঝুকি দেয়।
-বুঝলাম। তো তোদের মধ্যে প্রেম হলো কী করে?
-এখন আমি বাড়িতে বসে তোকে প্রেম কাহিনী বলব?
-ওকে ওকে ঠিক আছে। এটা শুধু বল অপুদের বাড়ির কেউ জানে কিনা।
-জানেনা বলেইতো এখনো সাহস দেখাতে পারছি। বাবাতো জানে অপুই বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করে। আমিও যে ডুবে ডুবে শালুক তুলি সেটা এখনো জানেনা।
-তোর সাথে আর কথাই নাই। তুইনা বললি তোর পরিবার জেনে গেছে? তুই বিপদে আছিস, চিন্তায় আছিস। তোকে সাহায্য করতে হবে। সব মিথ্যে বললি আমাকে?
-আরে মিথ্যে বলব কেন? বাবা জানেনা তো কী হয়েছে? দাদীর কাছে বলেছিলাম। দাদী বলে দিছে দাদার কাছে। দাদা রাগ দেখিয়ে চিল্লাচিল্লি করে বলেছে, আমার মেয়েকে ২৪ বছর ধরে মেনে নেইনি এই বাড়ির সম্পর্কের জন্য। আবারো যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় তাহলে কারো রক্ষা নেই।
ভাগ্যিস বাবা তখন বাড়ি ছিলনা। মা গিয়ে দাদাকে বলেছে, বাবা আমি শাসন করব। আপনি আর বলিয়েননা এসব, মানুষ মন্দ বলবে।
রাতে আমার স্থান হলো বশিরের সাথে। ভাবছি ঘুমের মধ্যে আমাকে মেরে বসবেনাতো? সকালে শানুর সাথেই কলেজে যাব। বশির সাথে না গেলেই হয়। খন্দকার বাড়ির সাথে এত বিরোধ অথচ বশির অপুকে মেনে নেয় আমাকে মেনে নেয়না। আবার ভাবছি অপু খন্দকার বাড়ির হলে আমি কোন বাড়ির? মনে পড়তেই ঠোটের কোণে হাসির রেখা।
সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসলাম। আসতে দেয়নি। আরেকবার তিন চারদিনের জন্য যাব তেমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারপর আসতে হলো। কলেজে থেকেই বাবাকে ফোন দিলাম। বললাম একজন মেহমান আসবে আমার সাথে, তিনি যেন ভালো বাজার করেন। বাবা মা'কে ফোন ধরিয়ে দিলেন।
-কয়জন আসবে মেহমান?
-একজনই মা। তুমি রান্না করো।
-কী রান্না করতে হবে?
-ধরো তোমার পুত্রবধূর জন্য তুমি রান্না করবে। এখন কী কী রাধবে সেটা তুমি ভেবে নাও।
-যদি পুত্রবধূই আসে তাহলে আমি খাটে পা তুলে বসে থাকব। তোর বাবা বাজার করতে গেছে, তোর বউ আসলে রান্না করে আমাকে খাওয়াবে।
ফোন রেখে দিলাম। মায়ের সাথে কথায় পারবনা। তবে আজ মা'কে একটু চমকে দেব।
বারোটার দিকে আমি আর শানু আমাদের বাড়ির কাছাকাছি। সে আসতে চায়নি, তাকেও বলেছি একটা চমক দেব। নয়াচরে নানা নানীকে পরিচয় দেইনি, কারণ বাবা মা'কে তারা আজও মেনে নেয়নি। দেখা গেল পরিচয় দিলে বাড়িতেই ঢুকতে দিবেনা।
এখন পরিচয় দিলে সমস্যা হবেনা আশা করি। বাবা মা শানুকে দেখে কিছুটা চমকে গেছে। আমি কোনোদিন আমার মেয়ে বন্ধু বাড়িতে আনিনি। মা'কে ফোনে বলেছি চমকে দেব। শানুকে দেখে যে চমক পেয়েছে মা মনে করেছে এতটুকুই শেষ। আমি বললাম,
-মা ওর নাম শানু, দেখোতো ওর চেহারায় কারো মিল খোঁজে পাও নাকি?
মা আমার দিকে তাকিয়ে আবার শানুর দিকে তাকাল। বাবাও কিছু বুঝতে পারেনি। আমি আবার বললাম,
-মা তোমাকে না বললে চিনবেনা। সে তোমার ভাইয়ের মেয়ে। আল-আমিন মামার মেয়ে।
মা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, কিযে বলিসনা তুই। সবসময় ফাইজলামি।
আমি যখন মা'কে বলেছি মা সে আল-আমিন মামার মেয়ে। তখন শানু পুরোই হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবা বলল, শ্রাবণ আগে ঘরে নিয়ে আয় মেয়েটাকে। তারপর সত্যি করে বল কে।
আমি বললাম,
-আমি গতকাল বাবাকে ফোন করে বলেছিলাম আমি নানীর বাড়ি। বাবা বিশ্বাস করেনি তাই বলেছি রিয়াদদের বাড়ি। আমি গতকালই প্রথম শানুর সাথে নয়াচরে যাই। শানু সরকার বাড়ির মেয়ে। আমার সাথে কলেজে পড়ে।
মা আমার কথা শুনে শানুর দিকে এগিয়ে এল। বাবা আমাকে বলছে, খন্দকার বাড়ি গিয়েছিলি?
আমি বললাম না বাবা। তবে খন্দকার বাড়ি দেখেছি, ভিতরে যাইনি।
বাবা আবারো বলল, তোর দাদাকে দেখিসনি? ঐযে ছবিতে দেখিয়েছি।
বাবার চোখ ছলছল, আমি বললাম না বাবা দেখিনি। শানুকে মা কাছে টেনে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, আমাকে তুমি চিনবেনা। আমাকে কখনো দেখোনি তুমি। আমি তোমার ফুফু।
শানু আমাকে বলল, শ্রাবণ আমি কিছু বুঝতে পারছিনা।
আমি বললাম, এই তোমার সেই ফুফু। যার কথা তোমার দাদা বলেছিল।
মা সাথে সাথে জানতে চাইল, বাবা আমার কথা কী বলেছে? বলনা কী বলেছে?
আমি বললাম মা সবই বলব। তোমার ভাইজিকে খেতে দিবাতো আগে নাকি?
চোখ মুছতে মুছতে মা শানুকে নিয়ে ঘরে গেলেন। বাবাও চোখ মুছলেন। দাদার বাড়ির কথা শুনতেই জিজ্ঞেস করেছিল দাদাকে দেখেছি কিনা। সেই সাদাকালো ছবির লোকটি।
.
(........চলবে)
.
লেখনীর শেষ প্রান্তে,,,,,,,
👉মোঃআসাদ রহমান
ঝিনাইদ,কোটচাঁদপুর
শানুর মুখে মামার নাম শুনে তার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলাম। সে আমার বড় মামার মেয়ে। নানা নানীর আদর একাই পেয়েছে। আর আমি তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেছি। আশা নিয়ে আছি, হয়তো একদিন তাদের ভালোবাসা আমিও পাব।
আমাকে বাড়ির বাইরে দাড় করিয়ে শানু ভিতরে গেল। একটি মেয়ে হুট করেই কোনো ছেলেকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যেতে পারেনা। বাড়ির ভিতরের পরিবেশ সামাল দিতেই হয়তো আমাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু যখন দেখলাম শানু সাথে করে তার চাচাত ভাই বশিরকে নিয়ে এল তখন আমার কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থা। এমনিতেই বশির আমাকে দেখতে পারেনা আর আজ বাড়ি এসে উপস্থিত। তার গালের কাটা দাগ দেখলে আরো ভয় করে। আবার মনে হলো, শানুর চাচাত ভাই হলে নিশ্চয় বশির শামীম মামার ছেলে। বশির আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বলার আগে শানু বলল,
-বশির, তুই দাদুকে বলবি শ্রাবণ তোর বন্ধু। তোর কাছে এসেছে।
বশির আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে কিড়মিড় করে মুখে হাসির আভা দেখিয়ে বলল,
-আয় শ্রাবণ, ভিতরে আয়।
কাঠের চেয়ারটিতে যে বয়ষ্ক মানুষটি বসা তিনি হয়তো আমার নানা। পাশেই জলচৌকিতে হয়তো নানী। পান সাজিয়ে দিচ্ছেন। তাদের দেখিয়ে শানু বলল, শ্রাবণ আমার দাদা আর দাদী।
আমার চোখ ছলছল করছে। সালাম দিয়ে ধীরে কাছে এগিয়ে গেলাম। নানী জিজ্ঞেস করল, কেমন আছো?
আমার চোখ তবুও ছলছল করছে। মনে হচ্ছে কেঁদেই দেব। নিজেকে সামলে রেখে বললাম,
-আমি ভালো আছি, নানী আপনি কেমন আছেন?
আমার কাছে হয়তো দাদী ডাক আশা করেছিল। আমি নানী ডাকায় সবাই একে অন্যের দিকে তাকাল। এবারে নানী বসা থেকে উঠে আসল। নানীর চোখও ছলছল। আমার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইলেন,
-আমি শানুর দাদী, তুমি নানী ডাকলে কেন?
মাটির দিকে তাকাতেই দুই ফোটা পানি পড়ল চোখ থেকে।
-আমার নানী নেইতো, তাই নানী ডাকলাম।
নানীও আঁচলে চোখ মুছল। নানা পাশ থেকে বলছে, কী শুরু করলা? ছেলেটি আসছে, তাকে বসতে দাও। খেতে দাও আগে, তারপর কথা বলিও।
আমি হাতমুখ ধুইতে নলকূপে গেলাম শানুর সাথে। তখন চোখে মুখে বেশি করে পানি দিলাম। খুব ইচ্ছে করছে একটু কাঁদি। ইচ্ছে করছে মা'কে ফোন করে বলি, মা আমি নানীর বাড়ি এসেছি। চব্বিশ বছর আগে তুমি যে বাড়ি ছেড়ে গেছো সে বাড়িতে আমি এসেছি মা। ফোন দেয়া হয়নি।
খাবার সাজিয়ে দিলেন বড় মামি। দুই মামার এক মামাও বাড়ি নেই। দুপুর দেড়টা বাজে। তাদের এতক্ষনে আসার কথা। শানু বলছে,
-শ্রাবণ, এই মাছে ফরমালিন নেই। বেশি করে খা। সারাজীবনতো বরফ দেয়া মাছ খেয়েছিস।
শানুর কথায় আমার মন নেই। আমি ভাবছি দাদার বাড়ির দাদা দাদীও কি এমন করে আদর করবে আমাকে?
বিকেলে আমাকে নিয়ে শানু বের হলো। উদ্দেশ্য, অপুর সাথে দেখা করা। আমার সামনেই অপুকে ফোন দিচ্ছে শানু। তার রাগ দেখে বুঝা যাচ্ছে, অপু ফোন রিসিভ না করে বারবার কেটে দিচ্ছে। যেই একবার ফোন রিসিভ করল তখনই শানু এক নিঃশ্বাসে শুরু করল,
-এই তুই ফোন কাটোস কেন বারবার? আমার ফোন দেখিসনি তুই? কোথায় তুই? বের হয়ে আয়, এখন বের হবি তুই।
আমার মনে পড়ে গেল, শানু সেদিন আমার শার্টের কলার চেপে ধরেছিল। এখন অপুর সাথে ফোনে যেভাবে কথা বলল, তাতে বুঝাই যাচ্ছে অপুও প্রেম করে মহা ঝামেলায় আছে। শানু বলল এরই মধ্যে নাকি ওদের দুই পরিবারের মানুষ জেনে গেছে এই সম্পর্কের কথা। তাইতো কলেজে পরশুদিন শানুকে মন খারাপের কারণ জানতে চাওয়ায় বলেছিল অপুর কথা মনে পড়েছে। আমাকে বলেছিল আমি যেন কিছু একটা করি। অপুর সাথে দেখা করানোর কথা রয়েছে। কিন্তু অপু আসবে বলে মনে হয়না। আবার আরেক মন বলছে শানু যেভাবে শাসিয়েছে, যেখানেই থাকুক দ্রুত চলে আসবে।
অপু আর আসেনি। সে নাকি মেথিকান্দা রেলস্টেশনের কাছে। আসতে আরো সময় লাগবে।
সন্ধার একটু আগে বাবা ফোন দিয়ে জানতে চেয়েছে আমি কোথায়? বাড়ি যাইনি কেন কলেজ থেকে?
আমি হুট করে বলে ফেলেছি,
-বাবা আমি নানীর বাড়িতে, চিন্তা করোনা। রাতে থাকতে হতে পারে, কাল আসব।
-ফাইজলামি করোস? নানীর বাড়ি মানে?
ভাবতে লাগলাম, এখনই সব বলা ঠিক হবেনা। পরে অবস্থা বুঝে সব বলা যাবে। কথা ঘুরিয়ে বাবাকে বললাম,
-আমি দাসপাড়া রিয়াদের বাড়িতে। কাল সকালে এখান থেকেই কলেজ যাব।
সন্ধার পর দেখা মিলল দুই মামার সাথেই। এক মামা সন্ধায় আবার বাজারে ছুটলেন। বললেন, দুপুরে বাড়ি ছিলামনা। কি দিয়ে না জানি খেয়েছো বাবা। আমি যাব আর আসব।
পুকুরপাড়ে গাছের গুড়ি রাখা, বসে পড়লাম সেখানে। কানে হেডফোন গুজে দিয়ে গান শুনছে শানু। আমার বিরক্ত লাগছে তার এমন আচরণে। তবে তার মাথা ঈষৎ নাড়ানো দেখে ভালো লাগছে। চেহারায় কোনো মায়া মায়া ভাব নেই। ওর তো মায়াই নেই, যে ব্যবহার। কী দেখে যে ভালো লেগেছিল জানিনা। এখন কত শান্ত লাগছে। অপুও এই গ্রামের। আমি দূর থেকে এসে শানুকে নিয়ে যাব এটা মেনে নিবেনা সে। অপুকে দরকার ছিল, কথা বলার জন্য। দুই পরিবারের মধ্যে তাদের নিয়ে কী কথা হয়েছে বা কোনো ঝগড়া হয়েছে কিনা আমি জানিনা। শানুর কান থেকে হেডফোন খোললাম।
-মামা জানে তোদের ব্যাপারটা?
-কোন মামা?
- আরে তোর বাবা জানে নাকি অপুর কথা?
-জানে মানে? অপুকে রাস্তায় দাড় করিয়ে বলে দিয়েছে যে, বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে দেখলে হাত পা ভেঙ্গে দেবে।
-তো বাড়ির আশেপাশে আসে কেন? তুই লেখাপড়া করিস আমাদের সদরে। সেখানে গিয়ে দেখা করলে কী হয়?
-সে তাদের চাউলের আড়তে বসে। আসার পথে আর যাবার পথে দেখা করার জন্য উঁকি ঝুকি দেয়।
-বুঝলাম। তো তোদের মধ্যে প্রেম হলো কী করে?
-এখন আমি বাড়িতে বসে তোকে প্রেম কাহিনী বলব?
-ওকে ওকে ঠিক আছে। এটা শুধু বল অপুদের বাড়ির কেউ জানে কিনা।
-জানেনা বলেইতো এখনো সাহস দেখাতে পারছি। বাবাতো জানে অপুই বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করে। আমিও যে ডুবে ডুবে শালুক তুলি সেটা এখনো জানেনা।
-তোর সাথে আর কথাই নাই। তুইনা বললি তোর পরিবার জেনে গেছে? তুই বিপদে আছিস, চিন্তায় আছিস। তোকে সাহায্য করতে হবে। সব মিথ্যে বললি আমাকে?
-আরে মিথ্যে বলব কেন? বাবা জানেনা তো কী হয়েছে? দাদীর কাছে বলেছিলাম। দাদী বলে দিছে দাদার কাছে। দাদা রাগ দেখিয়ে চিল্লাচিল্লি করে বলেছে, আমার মেয়েকে ২৪ বছর ধরে মেনে নেইনি এই বাড়ির সম্পর্কের জন্য। আবারো যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় তাহলে কারো রক্ষা নেই।
ভাগ্যিস বাবা তখন বাড়ি ছিলনা। মা গিয়ে দাদাকে বলেছে, বাবা আমি শাসন করব। আপনি আর বলিয়েননা এসব, মানুষ মন্দ বলবে।
রাতে আমার স্থান হলো বশিরের সাথে। ভাবছি ঘুমের মধ্যে আমাকে মেরে বসবেনাতো? সকালে শানুর সাথেই কলেজে যাব। বশির সাথে না গেলেই হয়। খন্দকার বাড়ির সাথে এত বিরোধ অথচ বশির অপুকে মেনে নেয় আমাকে মেনে নেয়না। আবার ভাবছি অপু খন্দকার বাড়ির হলে আমি কোন বাড়ির? মনে পড়তেই ঠোটের কোণে হাসির রেখা।
সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসলাম। আসতে দেয়নি। আরেকবার তিন চারদিনের জন্য যাব তেমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারপর আসতে হলো। কলেজে থেকেই বাবাকে ফোন দিলাম। বললাম একজন মেহমান আসবে আমার সাথে, তিনি যেন ভালো বাজার করেন। বাবা মা'কে ফোন ধরিয়ে দিলেন।
-কয়জন আসবে মেহমান?
-একজনই মা। তুমি রান্না করো।
-কী রান্না করতে হবে?
-ধরো তোমার পুত্রবধূর জন্য তুমি রান্না করবে। এখন কী কী রাধবে সেটা তুমি ভেবে নাও।
-যদি পুত্রবধূই আসে তাহলে আমি খাটে পা তুলে বসে থাকব। তোর বাবা বাজার করতে গেছে, তোর বউ আসলে রান্না করে আমাকে খাওয়াবে।
ফোন রেখে দিলাম। মায়ের সাথে কথায় পারবনা। তবে আজ মা'কে একটু চমকে দেব।
বারোটার দিকে আমি আর শানু আমাদের বাড়ির কাছাকাছি। সে আসতে চায়নি, তাকেও বলেছি একটা চমক দেব। নয়াচরে নানা নানীকে পরিচয় দেইনি, কারণ বাবা মা'কে তারা আজও মেনে নেয়নি। দেখা গেল পরিচয় দিলে বাড়িতেই ঢুকতে দিবেনা।
এখন পরিচয় দিলে সমস্যা হবেনা আশা করি। বাবা মা শানুকে দেখে কিছুটা চমকে গেছে। আমি কোনোদিন আমার মেয়ে বন্ধু বাড়িতে আনিনি। মা'কে ফোনে বলেছি চমকে দেব। শানুকে দেখে যে চমক পেয়েছে মা মনে করেছে এতটুকুই শেষ। আমি বললাম,
-মা ওর নাম শানু, দেখোতো ওর চেহারায় কারো মিল খোঁজে পাও নাকি?
মা আমার দিকে তাকিয়ে আবার শানুর দিকে তাকাল। বাবাও কিছু বুঝতে পারেনি। আমি আবার বললাম,
-মা তোমাকে না বললে চিনবেনা। সে তোমার ভাইয়ের মেয়ে। আল-আমিন মামার মেয়ে।
মা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, কিযে বলিসনা তুই। সবসময় ফাইজলামি।
আমি যখন মা'কে বলেছি মা সে আল-আমিন মামার মেয়ে। তখন শানু পুরোই হতবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাবা বলল, শ্রাবণ আগে ঘরে নিয়ে আয় মেয়েটাকে। তারপর সত্যি করে বল কে।
আমি বললাম,
-আমি গতকাল বাবাকে ফোন করে বলেছিলাম আমি নানীর বাড়ি। বাবা বিশ্বাস করেনি তাই বলেছি রিয়াদদের বাড়ি। আমি গতকালই প্রথম শানুর সাথে নয়াচরে যাই। শানু সরকার বাড়ির মেয়ে। আমার সাথে কলেজে পড়ে।
মা আমার কথা শুনে শানুর দিকে এগিয়ে এল। বাবা আমাকে বলছে, খন্দকার বাড়ি গিয়েছিলি?
আমি বললাম না বাবা। তবে খন্দকার বাড়ি দেখেছি, ভিতরে যাইনি।
বাবা আবারো বলল, তোর দাদাকে দেখিসনি? ঐযে ছবিতে দেখিয়েছি।
বাবার চোখ ছলছল, আমি বললাম না বাবা দেখিনি। শানুকে মা কাছে টেনে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, আমাকে তুমি চিনবেনা। আমাকে কখনো দেখোনি তুমি। আমি তোমার ফুফু।
শানু আমাকে বলল, শ্রাবণ আমি কিছু বুঝতে পারছিনা।
আমি বললাম, এই তোমার সেই ফুফু। যার কথা তোমার দাদা বলেছিল।
মা সাথে সাথে জানতে চাইল, বাবা আমার কথা কী বলেছে? বলনা কী বলেছে?
আমি বললাম মা সবই বলব। তোমার ভাইজিকে খেতে দিবাতো আগে নাকি?
চোখ মুছতে মুছতে মা শানুকে নিয়ে ঘরে গেলেন। বাবাও চোখ মুছলেন। দাদার বাড়ির কথা শুনতেই জিজ্ঞেস করেছিল দাদাকে দেখেছি কিনা। সেই সাদাকালো ছবির লোকটি।
.
(........চলবে)
.
লেখনীর শেষ প্রান্তে,,,,,,,
👉মোঃআসাদ রহমান
ঝিনাইদ,কোটচাঁদপুর
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন