বিয়ে বাড়ির গেটে ছোট শিশু কাঁদছে। হতভাগা বাবা হয়ে মেয়েকে , তার-ই মায়ের বিয়ে দেখাতে নিয়ে আসছি! পৃথিবীতে এমন বেদনাদায়ক দৃশ্য আর দু'টি হতে পারে না। মেয়েটা তার মায়ের দিকে, এক নয়নে চেয়ে আছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে আকুতি জানাচ্ছে তার মাকে এমন করে " মা মা তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। "
না ছোট বাচ্চার হাজারো আকুতি আজ কথার কর্ণপাত হবে না ।( আমার বউয়ের নাম ছিল কথা)। সে তো নতুন করে জীবন গোঁছাতে ব্যস্ত।
মেয়েটাকে কুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি বিয়ে বাড়ির সামনে। চোখ দিয়ে টুপ-টাপ করে পানি পড়ছে। জানি না কতটা কষ্ট পেলে ছেলে মানুষগুলো কাঁদে। কুলে সাতমাসের বাচ্চাটাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছি। শেষ বারের মতো মেয়েটা যেন তাঁর মা টাকে দেখছে । কিছুক্ষণ পর পর কান্না করে দিচ্ছে। জানি না কান্নার আওয়াজ তার মায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছিতে পারছে কি না!
আজকে রাইসার মা'টাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। লাল শাড়িতে কথাকে মনে হচ্ছে সাক্ষাত পরী। দূর থেকে তাকিয়ে ভালবাসার মানুষটাকে দেখছি। যেমনি দেখেছিলাম কলেজের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে। নীল শাড়িতে। যে এসেছিল নীল শাড়ি পরে, আজ সে সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে চলে যাচ্ছে লাল শাড়ি পরে।
যার সাথে একি ছাঁদের নিচে একবছর ছিলাম। পরে ডির্ভোসটা সেই দেয়। কারণ আমি ছিলাম গরীব। প্রথমে ভালবেসে বিয়ে করলেও পরে আর সে ভালবাসা ছিল না। সময়ের সাথে সাথে সব হারিয়ে যায়। বাস্তবতার কাছে ভালবাসা বিয়ের আগের ভালবাসা গুলো বিয়ের পর সস্তা আবেগে পরিণত হয়।
.
এই যে রাজ ভাইয়া, আপনি আর কি চান? কথার জীবনটাতো নষ্ট করে দিয়েছেন। এখন কেন দাঁড়িয়ে আছেন এখানে? লজ্জা করে না। আপনার চড় খাওয়ার পরও স্বাদ মেটেনি? কথা আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে বলছে। আপনি যাবেন? ( নুসরাত)
.
নুসরাতের দিকে চেয়ে দেখি, তার চোখে পানি টলমল করছে। নুসরাত শোন, কথাকে বলিস, ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে হবে না। আমি নিজেই চলে যাচ্ছি। শেষ বারের মতো,কলিজার টুকরাটাকে দেখে নিলাম ।
.
এখন ট্রেনে বসে আছি। রাত প্রায় একটা। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে বুকে। বুকের ভেতরটা চিন-চিনে ব্যথা করছে। হঠাৎ রাইসা ঘুম থেকে উঠে কান্না করতে লাগল। ব্যাগে থাকা ফিডারের বোতলটা রাইসার মুখে ধরলাম! খাচ্ছে না, আরো বেশি করে কান্না করছে।
.
পাশের সিটে বসে থাকা আঠারো কিংবা ঊনিশ বছরের একটা মেয়ে বলে উঠলো" আপনি তো মেয়েটা চুরি করে আনেননি? "
.
মেয়েটার কথা শুনে, ট্রেনের ওই বগিতে থাকা অন্য যাএীরা আমার দিকে কেমন করে যেন তাকালো।
পাশ থেকে এক বয়স্ক মহিলা বলে উঠলো - সত্যিই মনে হয় ছেলেটা, বাচ্চাটাকে ছেলেটা চুরি করে এনেছে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য! মার ও খেয়েছে। গালে এখনো কারো হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে আছে।
সামনে স্টেশন আছে। পুলিশকে জানানো দরকার। পুলিশের ডান্ডা শরীরে পড়লেই সব বলে দিবে।
আপনারা কি বলছেন? আমার কলিজার টুকরাকে কেন চুরি করবো। কোন বাবা তার মেয়েকে চুরি করে?
.
পাশে বসে থাকা মেয়েটা বললো- তাহলে বাচ্চার মা কোথায়? এতটুকু বাচ্চার মা সাথে আসবে না এমন তো কোন কথা নয়। বলেন বাচ্চার মা কোথায়। আর সত্যি বলবেন, তা না হলে পুলিশকে সব বলে দিবো। ইশ বাচ্চাটা তার মায়ের জন্য কীভাবে কান্না করছে!
পাশ থেকে একটা বয়স্ক লোক বলে উঠল মেয়েটাকে" মামনি বাচ্চাটাকে তুমি কুলে নাও তো, সামনে স্টেশনে দেখছি, কি করা যায়"!
.
-এদিকে রাইসা আমার কুলে কান্না করেই যাচ্ছে।
- পাশে থাকা মেয়েটা, আমার কুল থেকে যখনি রাইসাকে নিয়ে নিলো। আমার মনে হচ্ছে কলিজাটা কেউ ছিড়ে নিয়ে নিল।
.
-আপু প্লিজ বিশ্বাস করেন। এটা আমার মেয়ে।
-বুঝলাম আপনার মেয়ে, তাহলে বাচ্চার মা কোথায়। বাচ্চাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
.
-
শুনবেন?তাহলে রাইসাকে আমার কুলে দেন। তা নাহলে আরো বেশি কাঁদবে। মেয়েটার কুলে রাইসা আরো বেশি কাঁদছে।
রাইসাকে মেয়েটার কুল থেকে নিয়ে গালি মুখে চুমু দিতেই কান্না থামিয়ে দিল। রাইসাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম- বাচ্চার মা এখন তার বাসর ঘরে।
.
আমার কথা শুনে সবাই বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকালো। রাইসা এখন কান্না থামিয়ে সবার দিকে চেয়ে আছে।
যাকে নিজের থেকেও বেশি ভালবাসলাম, সে মানুষটা আজ অন্যের বাসর ঘরে।আর গালে যে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ দেখতে পাচ্ছেন!
সেটা আমার ভালবাসার পুরস্কার। পুরস্কারটা আমারি ভালবাসার মানুষ দিয়েছেে।
তাহলে শুনেন! বাকিটা,
আজ থেকে দু'বছর আগে।
মেসে শুয়ে আছি। রুমমেট একটা ছেলে বললো" রাজ ভাইয়া কথা আপু এসেছে।" আচ্ছা তুই আসতে বল কথাকে। কথা রুমে এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরে। এমন ঘটনায় আমি অনেকটা হতভম্ভ হয়ে যায়। এই কথা কাঁদছো কেন? এই পাগলী কি হয়েছে বলবে তো?
.
রাজ বাবা বাসা থেকে বিয়ে ঠিক করেছে। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। তুমি আমাকে বিয়ে করো।
.
কথা এখন কিভাবে সম্ভব? তুমি জানোই তো আমার টিউশনি করে পড়ালেখা চলে। তুমি বরং তোমার বাবার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করে নাও! বুকের ভেতর কষ্টকে চাঁপা রেখে কথাটা বললাম।
-রাজ আমি পালিয়ে এসেছি। তুমি যদি বিয়ে না করো তবে আমার লাশ বাড়িতে যাবে। আমি নুসরাত আর কণাকে সব বলেছি ওরা কাজি অফিসে থাকবে। বলো আমায় বিয়ে করবে তো?
-আমি মাথা নাড়িঁয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিলাম। কথা আমাকে বাহির থেকে একপাতা টিপ নিয়ে যেতে বলেছিল। টাকার অভাবে সেটিও নিতে পারিনি।বন্ধুদের সহায়তায় বিয়েটা হয়ে যায়।
বাসর রাতে, কথা আমাকে তাঁর মাথা ছুঁয়ে প্রমিজ করায়। জীবনে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে যেন ভালো না বাসি। আমি যেন তাকে কষ্ট না দেই। আমি তাই করেছিলাম। বাসর রাতে দুজন -দুজনের পাশে সারাজীবন থাকার ও ওয়াদা করেছিলাম।
.
- দিনগুলি ভালোই কাটতেছিল। কিছুদিন পর কথা অসুস্থ হয়ে পড়লো। ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে পারি কথা মা হতে চলছে আর আমি বাবা। ভালবাসায় ঘরটা যেন ভরে উঠলো।
কিন্তু হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়ে সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। কথা কিসের জন্য জানি আমাকে ভুল বুঝলো। শুনলাম সেদিন সকালে তার বাবাও এসেছিল। তার বাবার সাথেই সে চলে যাবে। আমি তাকে ঠকিয়েছি। তার বাবার সাথে যাওয়ার আগে সে একটা চিরকুট লিখে বাড়িওয়ালাকে দিয়ে গিয়েছিল।
.
অফিস থেকে এসে দেখি দরজায় তালা দেওয়া। বাড়ি ওয়ালা একটা চিঠি ধরিয়ে দিয়ে বললো "কথা আপু এটা আপনি আসলে এটা দিতে বলেছে "!
.
চিরকুটটা খুলতেই চোখ কোণের অশ্রু ভীড় করতে লাগল! চিঠির শেষ কথা ছিলো,যদি কখনো ভালোবেসো তাহলে আমাকে খুঁজতে এসো না! আমি বাবার কাছে চলে গেলাম।
ইতি,
কথা।
.
তার পর আর যায়নি। কিন্তু যখন জানতে পারলাম কথার বাবা,আমার সন্তানকে মেরে ফেলবে তখন আর থাকতে পারিনি। রাইসা জন্ম নেওয়ার সাথে নাথেই, নার্সকে বলে রাইসাকে চুরি করি। আজ কথার বিয়ে, তাই শেষ বারের মতো, মেয়েটাকে তার মাকে দেখিয়ে নিয়ে আসলাস। আর আমাকে দেখেই, গালে ভালোবাসার প্রতিদান দিয়েছে।
.
সামনে সিটে বসে থাকা মেয়েটা কাঁদছে। রাইসাকে আমার কুল থেকে নিয়ে কপালে চুমু এঁকে দিল।
ট্রেনের ওই বগিতে থাকা সবাই কাঁদছে। সামনে স্টেশনে সবাইকে বলে যখন নেমে পড়ি, তখন মেয়েটা এসে গলা থেকে একটা স্বর্ণের চেইন খুলে রাইসার গলায় পড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। আমি অজানা গন্তব্যে হাঁটছি। চোখ থেকে গড়িয়ে পানি পড়ছে।
.
প্রায় দু'বছর পর। এখন রাইসা হাঁটতে পারে! কথা বলতে পারে। এদিকে আমি মোটামুটি ভালো বেতনের চাকরি করি। একটা বেসরকারি চাকরির আবেদন করেছিলাম। বেতনও অনেক বেশি। ইনশা-আল্লাহ্ সেখান এ প্রাথমিক পরীক্ষায় এলাও হওয়ার পর ভাইবার জন্য ডাকে।
.
ভাইবা পরীক্ষার জন্য বসে আছি। হঠাৎ আমার ডাক পড়ল।
.
আমি দরজায় গিয়ে বললাম' ভেতরে আসতে পারি?
.
-আসেন মিস্টার রাজ।
কণ্ঠটা খুব পরিচিত লাগছে। মনে হচ্ছে খুব চেনা। মাথাটা তুলে তাকাতেই শরীরটা অবশ হয়ে আসলো। এতো বছর পর কথাকে এভাবে দেখতে পাবো ভাবতে পারিনি।
চলবে..................?
.
wait for next part...............?
বিঃদ্রঃ পরের পর্বের জন্য অপেক্ষা করুন ধন্যবাদ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন