জিয়ারা মৌলি আদেশ করার আগেই তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। মৌলি শাড়িটার দিকে তাকালো, শাড়িটা সুন্দর ও বলতে পারছে না, আবার মারাত্মক সুন্দর ও বলতে পারছে না, পার্পল রঙের শাড়িটা বেশ ভালোই লাগলো মৌলির কাছে। নিলয়ের পছন্দের আরো একবার তারিফ করতে হলো তাকে। মনের ভিতর খুশির জোয়ার বইছে মৌলির, এই প্রথম নিলয় তাকে নিজে থেকে কিছু দিলো। প্রিয় মানুষের থেকে জীবনের প্রথম কিছু পেলো। একবার পড়ে দেখতেই পারে! তাকে কেমন লাগবে শাড়িটা তে। মৌলি মোবাইল টাতে কয়টা বাজে দেখলো। নাহ্ নিলয়ের আসার সময় হয়ে গেছে। মৌলি শাড়িটা প্যাকেটে ভরে আলমারিতে রেখে দিলো।
মৌলির আন্দাজ ঠিক হলো। নিলয় একটু পরেই এসে রুমে ঢুকলো। ক্লান্ত দেখাচ্ছে, কিন্তু এতোটাও বুঝা যাচ্ছে না, ঘেমে কালো হয়ে গেছে।
নিলয় হেসে জিয়ারাকে বললো,
-- আম্মু,,
বেশি দেরি না করে আলমারি খুলে ব্যাগটা রাখলো। তখনি চোখে পড়লো, মৌলির জন্য আনা শাড়িটা,নিলয় মৌলি কে বললো,
-- মৌলি তোমার শাড়িটা পছন্দ হয়েছে? দেখেছিলে?
মৌলি নিলয়ের দিকে তাকালো, কিছু বলার আগেই নিলয় আবার বললো,
-- আসলে রুবির পার্পল রং পছন্দের ছিলো। আর ওকে পরলেও ভালো লাগতো। তাই...
নিলয়ের পুরো কথটা শেষ হওয়ার আগেই মৌলি বললো,
-- তাই কিনে ফেলেছন, কিন্তু পরে মনে পরলো রুবি তো নেই, তারপর কাকে দিবেন ভাবতে লাগলেন, আন্টি তো এমন শাড়ি পড়বে না, তাই আমাকে দিয়ে দিলেন।
মৌলি নিলয়ের চেহারাটা ভালো করে দেখলো, চেহারার আদল পাল্টে গেছে, কারণ আসলে সে যা বলছে তা সত্যি নয়। আসলে মৌলি নিলয়কে পরীক্ষা করছে, কোনোদিক দিয়ে নিলয় রুবির জন্য শাড়ি কিনে নি তো?অভ্যাসবশত রুবির জন্য শাড়ি কিনতেও পারে।
নিলয় মাথা নাড়লো,
-- তোমার জন্যই কিনেছিলাম, কিন্তু তোমার কি রং পছন্দ জানি না, তাই রুবির যে রং পছন্দ ছিলো, ঐ রংয়ের শাড়ি কিনে নিয়ে এলাম।
-- রুবির কোন রঙ পছন্দ তা আপনি জানতেন নাকি!!
নিলয় মৌলির প্রশ্নে শুনে চোখ কুচকে বললো,
-- জানবো নাই বা কেনো? ও আমার স্ত্রী,ওর পছন্দ অপছন্দ আমি জানবো না তো কে জানবে!
-- তাহলে আমার পছন্দ অপছন্দ আপনার জানা দরকার!
-- তুমি তো আমার স্ত্রী না, তোমার পছন্দ অপছন্দ তোমার হাজবেন্ড রাখবে,,,
নিলয় মৌলির দিকে তাকাতেই মনে পড়লো,সে ওর হাজবেন্ড। মৌলির দিকে তাকালো, মৌলি হাসছে, মানে মৌলি তার কথা শুনে রাগ করে নি, আর রাগ করবেই বা কেনো! সে তো এই বিয়েটা মানেই না।
মৌলি হাসিয়ে থামিয়ে নিলয়ের দিকে তাকালো, বেশ গম্ভীরমুখ করলো, কিন্তু এখনো মুখে হাসি লেগে আছে, মনে হচ্ছে যেকোনো সময় ফিক করে হেসে দিবে।
-- আপনি রুবি কে কতটুকু ভালোবাসেন??
-- ভালোবাসার কখনো মাপা যায় না। আমি রুবিকে অনেক ভালোবাসি,যা পরিমাপ করা যায় না।
মৌলি আবার হাসলো,তবে এবার নিলয়ের কথা
শুনে, তার আগের বার জিয়ারার কাজ দেখে। তবে এতটুকু সে নিশ্চিত নিলয় তাকে তার মনে জায়গা দেয় নি। যাক নিলয় তাহলে তার প্রথমদিনের বলা কথা টা রাখছে, সে শুধু তাকে জিয়ারার মা হিসাবেই দেখছে চায়।
নিলয় বুঝতে পারছে না, মৌলি কেনো হাসছে, বেশ অদ্ভুত লাগছে তার কাছে, সে কি এমন বলেছে যাতে হেসে হুটোপুটি খাচ্ছে মৌলি, নিলয় মাথা নেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো।
এতক্ষণ মৌলি হাসলেও চোখের কোণে পানির উপস্থিতি টের পেলো। জিয়ারাকে বললো,
-- আমার বাবা মা আমাকে এখানে বিয়ে দিয়েছে যাতে আমি একটা সন্তান পায়, কারণ আমার কোনোদিন সন্তান হবে না বলে। নিলয় মানে তোর বাবা আমাকে বিয়ে করে এনেছে, যাতে তুই একটা মা পেয়ে যাস। ওরা তিনজনেই স্বার্থবাদী, আর ওদের স্বার্থের জন্য আমাকে বলি হতে হয়েছে।
কিছুক্ষণ মন খারাপ করে মৌলি বসে থাকে, ওর এখন কোনো কিছুতেই বেশি মন খারাপ হয় না, মনের সব অনুভতিগুলোই সেদিন হারিয়ে গিয়েছিলো, যখন শুনেছিলো সে কোনোদিন মা হতে পারবে না। জিয়ারার দিকে তাকালো মৌলি, হাসলো,
-- আচ্ছা, তুই বড় হবি কবে? সিনেমায় তো বাচ্চারা তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়,দুই ঘন্টা আধা ঘন্টার মধ্যে বড়ে প্রেম করে বিয়ে ফেলে। তুইও তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে যা। তারপর তুই বাসন কোসন, হাড়ি পাতিল, কাপড় চোপড় ধোয়া মোছা করবি। ভালো হবে না বল??
কিছুক্ষণ জিয়ারার দিকে তাকিয়ে রইলো, জিয়ারাও হা করে তাকিয়ে আছে তার দিকে, হাতে থাকা পুতুলটার জীবন শেষ করে ফেলেছে, হাত পা ছিড়ে ছিড়ে একেক জায়গায় ফেলে দিয়েছে। এমনভাব করছে যেনো সব বুঝে, কিন্তু কিছুই বুঝে না। জিয়ারা হাসলো, মুখ দিয়ে লা লা পরলো, ঐ নিয়েই মৌলির কাছে ছোটে এলো,
মৌলি জিয়ারার মুখটা ওর ওড়না দিয়ে মুছে বললো,
-- তারপর আমাকে সবাই স্টেপ মাদার বলবে! আর তার আগেই যদি চলে যায় তাহলে বলে দিচ্ছি, শুন তুই প্রেম করে বিয়ে করবি। দেখলি না আমি তো এরেঞ্জ ম্যারিজ করেছিলাম তার ফল কি হলো! তোকে ফ্রি পেলাম।
জিয়ারা আবার হাসলো, মনে হয় সে মৌলির কথাতে মজা পেয়েছে। মৌলি জিয়ারাকে নিয়ে বারান্দায় গেলো। বারান্দার গ্রিলগুলো শক্ত করে ধরে রেখেছে জিয়ারা, নিচে গাড়ি চলছে, লাইট জ্বলছে নিভছে। জিয়ারা বেশ আবাক হয়েই দেখছিলো।।
মৌমি বিছানায় শুয়ে ছিলো, নাহিদ পানির বোতল নিয়ে রুমে ঢুকেই বললো,
-- মৌলি কবে আসবে!
মৌমি মাথা তুলে বললো,
-- আসবে,, আর কিছুদিন মনে হয়।
-- তোমার মনে হয় আর দেরি সহ্য হচ্ছে না! কতোদিন পর বোনের সাথে দেখা হবে, হয়তো তুমি খুব এক্সাইটেড হয়ে আছো?
মৌমি উঠে বসলো, ছেলের মাথার চুলগুলোয় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
-- আর খুশি! ওর জীবনটা পুরো নষ্ট হয়ে গেলো, কতোটা কষ্ট আর জেদ নিয়ে এখানে আসছে তুমি জানো?
-- মৌলি ঐ বাচ্চাটাকে মেনে নেয় নি? ওর কিন্তু ওকে মেনে নেওয়া উচিত।
-- কি মেনে নিবে বলো তো? আমি বলেছিলাম ওর যখন বাচ্চা হবে না তখন ঐ বাচ্চাটাকে মেনে নিতে। কিন্তু সে সোজাসুজি বলে দিলো, দুধের সাধ ঘোলে মিটে না। এরপর আর কি!
নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
-- তুমি তোমার মা বাবার সাথে কথা বলো? ওরা তো ওকে বোঝাতে পারে!
মৌমি নাহিদের দিকে তাকালো, নাহিদ ও মৌমির দিকে তাকাতেই মনে পড়লো মৌমির সাথে তো ওদের কথা হয় না, ওরা কথা বলে না। কিছুটা সময় নিলো, আবার নাহিদ বললো,
-- মৌমি, তুমি তো ওদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতেই পারো। একদিন না একদিন কথা বলবেই। এখন একবার কল দিয়েই দেখো না, কতোদিন আর রাগ করে থাকবে বলো তো!
মৌমি মাথা ঝাঁকিয়ে শুয়ে পড়লো।নাহিদ মোবাইল টা হাতে নিয়ে মৌমির বাবার নাম্বার টা বের করলো। এখন কল হবে, রিসিভ করবে, হয় মৌমি এদিক থেকে অভিমান করে কথা বলবে না, ওদিক থেকে হ্যালো হ্যালো করে একসময় কেটে দিবে। আবার যদি মৌমি কথা বলে তাহলে ওদিক থেকে বিনা শব্দে লাইনটা কেটে যায়, মাঝে মাঝে বলে তুমি এখানে কল দিও না। তারপর মৌমি কিছুক্ষণ মোবাইল টা কানেই রাখবে, লাইন কেটে দেওয়ার পর যে আওয়াজ টা হয় ওটা শুনবে, তারপর মোবাইল টা রেখে দিয়ে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিবে। নাহিদ মোবাইল টা বালিশের নিচে রেখে দিলো, থাক এখন মৌমি কে কাঁদিয়ে লাভ নেই।
নিলয় মৌলির কাজকর্মগুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছে কয়েকদিন ধরে, ইদানীং জিয়ারাকে এড়িয়ে চলা তার কাজকর্মের একটা। তারপর সেই প্রথম কয়েকদিন যেভাবে ছিলো গম্ভীর, কারো সাথে কোনো কথা নেই, মুখে হাসি নেই, কোনো কথ জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যাওয়া। নিলয় বেশ চিন্তায় পরে গেলো। হঠাৎ করে মৌলি এমন পাল্টে কেনো গেলো? কি হয়েছে ওর?
মৌলি সবুজ রঙের পাসপোর্ট টা নেড়েচেড়ে দেখছে। দিনগুলো খুব তাড়াতাড়ি চলে যায় কেনো, মৌলি ভেবে পায় না
চলবে,,,,