কলেজ থেকে বাসায় ফিরছি। অটো থেকে নেমে বাসার সামনে থাকা টেইলার্সের দোকান টাতে হঠাৎ করে চোখ পড়তেই পুরো মেজাজ গরম হয়ে যায়....
তাড়াতাড়ি করে অটো ড্রাইভার কে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে টেইলার্সের ভেতরে গিয়ে বাবার বয়সি মানুষ টার গালে পরপর ৩ টা চড় দিয়েছি....
লোকটি চড় খেয়ে আমার দিকে পলকবিহীন তাকিয়ে আছে। হইতো ভাবছেন, এটা কি হলো??
ওনার ভাবনাতে আমার কিছু যায় আসে না, পেছনে ঘুরে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে,
শরীরের দাম যদি এত নগন্য মনে হই, ত পতীতা পল্লী আছে, যেখানে যাইতে পারেন।
মেয়েটা কাঁচুমাঁচু করে চোখ এদিক ওদিক করতে লাগলো....
আমি দোকানদারের দিকে আর এক পলক রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে, এমন টা আর একবার করবেন ত পরিনাম টা যে ভালো হবে না এটুকু জেনে রাখেন।
ততক্ষনে অনেক লোক জমায়েত হয়েছে। সবাই শুধু কানাঘুষা করছে, কেউ কেউ বলছে দোকানদারকে বিনা কারনে মেয়েটা চড় দিয়েছে ত কেউ কেউ বলছে, না না, নিশ্চয়ই কারণ আছেই...
আমি বাহিরে আসতেই সবাই চুপ হয়ে গেলো....
সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে, গেট খুলে তাড়াতাড়ি করে বাসার উপরে উঠে আসি...
হিজাব, হাত আর পা মোজাটা খুলে বিছানার উপরে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ি।
উপরে ফ্যান টা ঘুরছে অদম্য শক্তিতে।
চোখ টা বন্ধ করেছিলাম, হঠাৎ দোকান দারের করা কাজগুলো বার বার চোখে ভেসে আসছিলো,
ঘটনা টা ঘটেছে এমন, মহিলাটা হইতো জামা, সালোয়ার বা ব্লাউজ বানাবে, সেই জন্য হইতো মাপ দিতে এসেছে।
আর দোকান দার সেই সুযোগ টাই নিচ্ছিলো ইচ্ছেমতো মহিলাটার বুকেতে + কোমড়ের সাইড টাতেও বার বার হাত দিচ্ছিলেন। আর মহিলাটাও যে নোংরা প্রকৃতির সেটা ওনার আচরণ টাতে বুঝতে পেরেছি...
আম্মি হুরমুড় করে ঘরেতে প্রবেশ করলো...
কি হয়েছে??(আমি)
কি হয়েছে প্রশ্ন টাতো আমি করবো। কি করেছিস আবার বলতো...(আম্মি(
কিছু করিনি...(আমি)
ত নিচে তোকে নিতে সবাই কি বলাবলি করছে??(আম্মি)
মুখ আছে ওনাদের বলছে। কান আছে তোমার ইচ্ছা হলে শুনবা নইতো শুনবা না। বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে গেলাম....
শাওয়ারের নিচে বসে আছি আর কান্না করছি। মানুষ এতটা নোংরা হই কেমনে??
রাত্রে খাবার টেবিলে বসে আছি....
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে, মা তুলি, কি হয়েছে মা??
আমি মাথা তুলে, কিছু না বাবা...
কিছু একটা ত হয়েছেই। কি হয়েছে মা??(বাবা)
চোখ থেকে জল পড়ছে আমার, বাবা উঠে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে, খাবার টেবিলে চোখের পানি ফেলতে নেয় মা। কি হয়েছে আমায় বলো..
বাবা আমি আর পড়বো না...(আমি)
কি বলছো মা?? অনার্স শেষ হতে ত তোমার আর ১ বছর ও নেই। এই সময়ে...(বাবা)
১ বছর অবধি যদি বেঁচে না থাকি বাবা??(আমি)
ছিহ মা এমন কথা বলতে নেই...আমার পরীটার আয়ু হাজার বছর হোক(বাবা)
আমি বাবার হাত ধরে, একজন মুমিন হউয়া খুব কঠিন তাই না বাবা??
বাবা এবার বুঝতে পেরেছেন...উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে, অনেক কঠিন মা। আর এই যুগে ত আরো কঠিন...
হুম বাবা। (আমি)
তবে হার মানবে না মা। বিজয় হবেই...(বাবা)
মা রান্না ঘর থেকে এসে, আর বিজয়। বাড়িয়ালা সন্ধায় এসে বলে গেছেন কালকের মধ্যেই যেনো বাড়ি ছাড়ি...
আমি মাথা নিচু করে নেয়...
বাবা কিছু বললেন না। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন....
মা এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে, তোর বাবার লাখ লাখ টাকা নেই যে ২ দিন পরপর বাসা খুজে নিবে। তুই ত সব বুজিস মা। কিন্তু এইটুকু কেন বুজিস না??
আমি কিছু না বলে চুপ করে আছি...
রাত্রে বিছানাতে শুয়ে শুধু এপাশ ওপাশ করছি কিছুতেই ঘুম আসছে না।
অনার্সে প্রথম ইয়ারে যেদিন উঠি আমি কিন্তু এমন ছিলাম না।
অন্যদের মতো সিভিল ড্রেসে কলেজে যাওয়া। বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেউয়া, বন্ধুদের সাথে মজা করা। ফেইসবুকে ছেলেদের সাথে চ্যাটিং সবকিছুতেই পারদর্শী ছিলাম আমি....
কিন্তু আমার জীবন টা বদলানোর জন্য ১৪ই ফ্রেবুয়ারির ওই দিনটাই যথেষ্ট ছিলো....
গাড়িতে বসে ছিলাম প্রেমিক রাহুলের সাথে। আমাদের সামনের সিটে এসে বসলো এক মেয়ে তবে তার আপাদমস্তক কালো কাপড়ে ঢাকা ছিলো। আমি তাকে ওই অবস্তায় দেখে কিছু না অনেক টাই অবাক হয়েছিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম ঠান্ডার জন্য হইতো এমন করেছে কিন্তু শীতের মধ্যেও যখন দেখলাম ওনার কপালে কিছুটা ঘাম জমেছে তখন বুঝলাম ব্যাপার টা অন্য কিছু।
উনি আমার দিকে তাকিয়ে কিছুসময় কি যেনো দেখলেন...তারপর আমার হাত টা ধরে,
আপনি কি মুসলিম?? (উনি)
আমি হকচকিয়ে যায়, তবে সাথে সাথেই উত্তর দেয়, জি...
উনি রাহুলের দিকে না তাকিয়েই, ইনি কি আপনার প্রেমিক??
জি.. (আমি)
আপনি কি জানেন ইসলামে বিয়ের পূর্বে প্রেম নিষিদ্ধ?? (উনি)
আমি মাথা নামিয়ে নেয়...
আপনি ওনাকে অনেক ভালোবাসেন তাই না??(রাহুলের ব্যাপারে)
জি..(আমি)
যদি সত্যি আপনি ওনাকে ভালোবেসে থাকেন ত আপনি কি চাইবেন, একমাত্র আপনার জন্য উনি জাহান্নামে জলুক??(উনি)
কখনো ত এটা ভেবেও দেখিনি...(মনে মনে ভাবছি আমি)
বোন, প্রেম জায়েজ আছে। বিয়ের পরের প্রেমে। হাজার টা সওয়াব আছে স্বামী স্ত্রীর পবিত্র প্রেমে। আর প্রেমিক প্রেমিকা যুগলে প্রেমেতে গোনাহ ছাড়া সওয়াব নেই। তাই দয়া করে এগুলো থেকে দূরে আর ইসলামের পথে আসুন...
কিছুদুর পরেই মেয়েটা অটো থেকে নেমে যান....
ওইদিনে বাসায় এসে, আমি অনেক ভেবেছি। এবং ভাবনাতে এতটা ডুবে ছিলাম যে দুনিয়ার চিন্তা ভুলে গেছিলাম। রাত্রে অনেক বাজে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে যায়। এতটা ভয় পেয়েছিলাম মনে হচ্ছিলো এই বুঝি আমার জান কবজ করতে আসছেন আজরাইল (আঃ)।
কান্না করে দেয় আমি...ভয় আর পূর্বের করা গোনাহের জন্য অনুতপ্ত ছিলাম আমি...
এরপর থেকে শুরু হলো আমার যুদ্ধ...
রাহুলের সাথে সব কন্টেক্ট অফ করে দেয়...।ফেবু থেকে নিজের ছবি + পুরো ফেইসবুক টাই ডিলিট মারি। কষ্ট হচ্ছিলো খুব এত দিনের গড়া আমার একটু একটু ভালোবাসাগুলোকে কবর দিচ্ছি।
হাত পা মোজা যেদিন প্রথম পড়লাম। আমার বান্ধবীদের কমেন্ট ছিলো...
কিরে পাগল হলি কবে থেকে?? মাথায় এই ভুত কে চাপালো??
বন্ধুদের কমেন্ট ছিলো,
তোকে দেখে আমাদেরি ত গরম লাগছে রে, সড় সড়...
পাড়াপ্রতিবেশিদের কমেন্ট ছিলো, এইসব ভন্ডামী ছেড়ে দাও...জঙ্গী জঙ্গী লাগছে...
বাবা খুশি হলেও মা খুশি হয়েছিলো না এই ভেবে যে মেয়েটাকে যদি কেউ না দেখতে পায় ত বিয়ে হবে কেমনে??
স্যারের কমেন্ট ছিলো,
এটা আবার কবে ত্থেকে শুরু করেছেন??
রাহুল একদিন পথ আগলে ধরে বলেছিলো, তুমি এগুলো ছেড়ে দাও...
আমি রাহুলের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, তোমায় ছাড়তে পারবো তবুও ইসলাম কে ছাড়তে পারবো না।
রাহুল ব্যজ্ঞস্বরে বলেছিলো, জানি ত, বুঝি ত আমি। নতুন নাঙ জুটাইছোস তুই যার জন্য এখন এইসব ভঙ্তাবাজি করছোস...
এতটা আঘাত পেয়েছিলাম ওইদিন যে প্রতিটা রাস্তাতে চোখ থেকে পানি পড়ছিলো।
কিন্তু এইটুকু বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম যে, যে যেমন ক্যারেকটারের সে আমাকে ঠিক তেমন টাই ভাববে....
আর এই সমস্ত কিছুর জন্য আমার বাবাকে বার বার বাসা বদলাতে হয়েছে...কোথাও কোন খারাপ কিছু দেখলে পর্দার আড়ালে থেকেই তার প্রতিবাদ করতাম জন্য তার প্রাপ্য হিসেবে বাড়িয়ালা বাসা ছাড়ার আদেশ দিতেন।আজ যেমন টা দিয়েছেন...
আমার বাবা মধ্যবিত্ত। তার ও তেমন অবস্থা নেই যে বার বার বাসা বদলাবে। মাঝে মাঝে মনে হই এগুলো থেকে দূরে থাকতে কিন্তু পারি নাহ। এর প্রতিবাদ না করলে যে আমাকেও হইতো এর জন্য জবাবদিহির সামনে পড়তে হতে পারে, সেই ভয়টা আজও আমার মনেতে ভালোভাবেই গেঁথে আছে।
নাহ আজ আর ঘুম আসবে না...।
উঠে বসে পড়লাম। ওয়াশরুম থেকে অযু করে এসে কুরআন টা নিয়ে পড়তে লাগলাম। মনে এক প্রশান্তি আসছে সাথে নিজেকে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা থেকে দূরে রাখারো পথ খুলে যাচ্ছে...মুচকি হাসি স্পষ্ট হতে লাগলো আমার মুখেতে ...
লেখাঃ মোঃআসাদ রহমান