রিয়ান বিছানায় বসে ঘুম ঘুম চোখে তারিনকে ডাকছে...............
গতকাল রাতেই ওদের বিয়ে হয়েছে। তারিন ডাক শুনে সামনে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এক কাপ চা দিবেন কষ্ট করে .......
মেয়েটার চুপচাপ চলে যাওয়া দেখছে রিয়ান। ঠিক চারমাস আগে রাতে বাড়ি ফেরার পথে রিয়ানের গাড়িতে মেয়েটার এক্সিডেন্ট হয়। কয়েকদিন পর জ্ঞান ফিরেছিল। এক্সিডেন্টে তারিনের পার্মানেন্ট মেমোরিলস হয়। অনেক খুঁজেও তারিনের পরিবারের কেউকে পায়নি রিয়ান। হয়তো তারা ওকে ফেরতই নিতে চায় না! তারিন!! হ্যাঁ নামটা রিয়ানেরই দেয়া!
তারিন চায়ের কাপটা এগিয়ে দিতেই রিয়ানের ঘোর কাটে। রিয়ান জিজ্ঞেস করলেন, মা-বাবা ঘুম থেকে উঠেছেন। জ্বী আপনাকে তাদের রুমে ডাকছেন, বলে বারান্দায় চলে গেল তারিন।
রিয়ান ফ্রেস হয়ে বাবা-মায়ের রুমে গেল। মা আলমারি থেকে সবুজ একটা জামদানী বের করতে করতে বললেন, আজ তোর দুই খালামনি আর বাকি সবাই আসবেন। হুট করে একা একা বিয়েটা করে ফেললি বলেই জাহানারা বেগম একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়লেন...
তারিনের হাতে জাহানারা বেগম শাড়ি আর গহনা তুলে দিলেন। মেয়েটাকে তার আর রিয়ানের বাবা দুজনেরই পছন্দের, চারমাসে মেয়েটা তাদের মন জয় করে নিয়েছে। তারাও ভেবেছিলেন রিয়ান আর তারিনের বিয়ের ব্যাপারে কিন্তু হুট করে ছেলেটা একা একা কেন বিয়ে করে নিলো ব্যাপারটা তাদের মাথায় আসছে না.....
কলিংবেল বাজছে...
তারিন দরজা খুলতেই অলিককে দেখে মাথা ঘুরে পরে গেল.........!
#অর্ধাঙ্গী
#পর্ব_২
অলিক কোলে করে তুলে সোফায় বসালো তারিনকে। মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে অত্রি বলে চিৎকার করে কেঁদে দিলো.....
অলিকের পেছন পেছন রিয়ানের দুই খালামনি আর কাজিনরাও ঢুকলো। রিয়ান ও তার বাবা-মা দৌঁড়ে এলেন ভেতর থেকে। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই স্তব্ধ!
রিয়ান অলিকের কাছ থেকে তারিনকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। কপালে আলতো করে একটা চুমু দিলো, এ যেন কোন ঘুমন্ত রাজকুমারী!
গতকাল বিকেলে তারিন নাচ শেখাচ্ছিল স্নেহাকে, স্নেহা রিয়ানদের পাশের ফ্লাটে থাকে। বয়স ৪/৫ বছর। তারিন আপন মনে নাচে আর স্নেহা হাততালি দেয়। হুটকরে কারো সাথে ধাক্কা লেগে গেলে তারিন চোখ তুলে দেখে রিয়ান দাঁড়িয়ে। স্নেহা রিয়ানকে দেখে পালিয়েছে ততক্ষণে। রিয়ান শক্ত করে তারিনের কোমর জড়িয়ে ওর ঠোঁট স্পর্শ করে.....
তারিন কোনভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে কেঁদে ফেলে। রিয়ান হাত টানতে টানতে ওকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়! সন্ধ্যার পর তারিনকে বিয়ে করে বাসায় নিয়ে আসে। তারিন ওর অর্ধাঙ্গী...
অলিকের চিৎকারে রিয়ানের ভ্রম কাটে। অলিক রিয়ানের খালাতো ভাই, দু'জনে সমবয়সী। হঠাৎ মনে আসে অলিক অত্রি বলে কেঁদে দিয়েছিল কেন! কে এই অত্রি.........!
#অর্ধাঙ্গী
#পর্ব_৩
রিয়ান দ্রুত ড্রইং রুমে আসলো। সবাই অলিককে ঘিরে আছে, কোন ভাবেই তার কান্না থামানো যাচ্ছে না। রিয়ান আসতেই অলিক তাকে জড়িয়ে ধরে বললো ভাই আমার অত্রিকে ফিরিয়ে দে...... ও যে আমায় মাফ করেনি :'(
রিয়ান হাত ধরে ওকে বেডরুমে নিয়ে গেল। তারিন এখনো অজ্ঞান। অলিক তারিনকে ধরতে যাওয়া মাত্র রিয়ান ওকে সরিয়ে দিয়ে বললো, এখন বল কি হয়েছে! অত্রি কে!!
অলিক মেঝেতে বসে পরলো...
অত্রি আমার ভার্সিটির জুনিয়র। সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে ওর সাথে আমার প্রথম পরিচয়। প্রাণবন্ত, চটপটে একটা মেয়ে...
জানিস ভাই, ওর হাসি দেখলে মনে হতো আমার সারাদিনের ক্লান্তি শেষ! আমার সকল সমস্যার সমাধান ওর জানা! আমি বলতে মেয়েটা অজ্ঞান ছিল। আমার ভরসায় এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে চলে আসলো আর আমি.........
রিয়ান অলিকের কাঁধে হাত রাখলো। শান্ত হ......কি হয়েছিল বল!
অত্রি আর আমার পাঁচ বছরের সম্পর্ক! ভার্সিটির শুরু থেকে শেষ অবদি। জানিস ভাই ও খুব সুন্দর নাচতে পারে..............
কথাটা শুনে রিয়ান আতকে উঠলো! এক পলক তারিনকে দেখলো। এক ঘন্টা হয়ে গেল অথচ এখনো মেয়েটার জ্ঞান ফিরলো না!
রিয়ান দ্রুত উঠে ডাক্তার রহমানকে কল দিলো। এক্সিডেন্টের পর থেকে উনিই তারিনকে দেখছে। অলিক এখনো দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে। আধ ঘন্টার মধ্যেই ডাক্তার চলে এসেছেন। খুব খুটিয়ে তারিনকে দেখছেন। কিছু ঔষুধ লিখে রিয়ানের হাতে দিতে যাবে ওমনি প্রেসক্রিপশনটা টেনে নিয়ে অলিক বাইরে চলে গেল।
অলিককে বাইরে যেতে দেখে সবাই রিয়ানের রুমে আসলো। কিন্তু ডাক্তার সবাইকে বের করে দিলেন।
রিয়ান জেরিনের মাথার পাশে বসে আছে, ওর চোখের পানি টপটপ করে জেরিনের গালে পরতেই জেরিন চোখ মেলে তাকালো......!
#অর্ধাঙ্গী
#পর্ব_৪
অলিক বাসায় ঢুকতে নিবে এর মধ্যে রিয়ান বাঁধা দিলো। এখানেই দাঁড়িয়ে থাক.........
কথা শেষ কর বলছি............................
অলিক হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পরলো। তার জন্য অত্রির আজ এই পরিনতি! মেয়েটাকে সেদিন তাড়িয়ে একবার খুঁজতেও বের হয়নি! এত রাতে অচেনা শহরে মেয়েটা কোথায় যাবে একটা বার কেন সে ভাবলো না!
পাঁচ বছরে যতভাবে সম্ভব মেয়েটা আমাকে সাপোর্ট করেছে। আমার ডিপ্রেশন কাটানো থেকে শুরু করে, খাবার, জামাকাপড়, লেখাপড়া, প্রোজেক্ট, রিপোর্ট......সব! সবকিছু! অসুখ হলে রাত-বিরাতে বাসা থেকে বের হয়ে ঔষুধ কিনে হাতে ধরিয়ে দিয়ে যেত। হাজারটা বার ফোন দিয়ে খোঁজ নিত। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে কথা বলতাম না, যা তা ব্যবহার করতাম যেন চলে যায়! কিন্তু কখনো আমায় ছেড়ে যায়নি! সবাই ওকে বলতো আমি ছেড়ে চলে যাবো, কিন্তু আমার পাগলীটা কখনো মানতো না!
কি বোকা অত্রি তাই না! পড়া শেষে যেদিন ভার্সিটি ছেড়ে চলে আসি শেষবারের মত করুনার চোখে বলেছিল, আমায় নিতে এসো তাড়াতাড়ি! শেষ কথাটাও আমি রাখলাম না ভাই......
অলিক আবার কান্নায় ভেঙ্গে পরলো.........
তারিন ওঠার পর থেকে রিয়ানকে খুঁজছে। রিয়ানের সাথে কথা বলাটা খুব দরকার! মোবাইলটাও বিছানায় ফেলে গেছে ছেলেটা।
মাত্র ৪ মাস হলো তারিন রিয়ানকে চেনে। এই চারমাসে একবারের জন্যও তারিনকে অসম্মান করেনি রিয়ান। তারিনকে দিয়েছে অর্ধাঙ্গীর মর্যাদা! অথচ এই চারমাসে কোন আপনজন তাকে খুঁজতে এলো না!
অলিক রিয়ানের পা জরিয়ে কাঁদছে। ভাইরে মেয়েটা আমার নাম্বার বন্ধ পেয়ে একা একা বাড়িঘর ছেড়ে অন্য একটা শহরে চলে এলো। আমি যে ওকে বাসার দরজা থেকেই তাড়িয়ে দিয়েছি। যেই মেয়েটাকে আমাকে নিয়ে গর্ব করে সবাইকে বলতো, আমি তার পরিচয় কখনো কেউকে দেইনি! আমার পাগলীটা টাকা পয়সা কিচ্ছু চায়নি ভাই শুধু ভালোবাসা চেয়েছিল.....শুভ্র, নিঁখাদ ভালোবাসা! আমার মত মেরুদণ্ডহীন মানুষ ওর বিশ্বাসের মূল্যটা পর্যন্ত দিতে পারলাম না!
জানিস ভাই ঠিক এইভাবে আমার পা ধরে কেঁদেছিলো। আর আমি ওকে অস্বীকার করে বের করে দেই। সবার কাছে ভালো মানুষ সাজতে গিয়ে, নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলি!
আমাকে ফিরিয়ে দে ভাই। অত্রিকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। আমার পাগলীটা কি আমায় ভুলে গেছে? ডাক্তার তখন কি সব বললো! বল না ভাই, বল না......
তোর তারিন যে আমার অত্রি ভাই...........................
কথাটা শোনা মাত্র রিয়ান পা ছাড়িয়ে ওপরে চলে গেল। রিয়ান আসতেই তারিন ওকে জড়িয়ে ধরলো। কাল রাতের প্রতিটা মুহূর্ত ভেবে লজ্জায় লাল হয়ে গেল তারিন। রিয়ান যে তাকে আদর, ভালোবাসায় সম্পূর্ণ করে দিয়েছে!
দু'দিন হলো অলিক রিয়ানদের বাসায়। ডাক্তার রহমান আগেই সবাইকে সাবধান করেছেন কেউ যেন তারিনকে জোর করে কিছু মনে করাতে চেষ্টা না করে। পার্মানেন্ট মেমোরিলসে স্মৃতি ফিরে পাওয়া অকল্পনীয়! ঐদিকে অলিক কোন ভাবেই মানতে পারছে না যে অত্রি তাকে ভুলে গেছে!!
অনেকগুলো মাস কেটে গেছে! তারিনকে আজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। অনেক কষ্টের পরও রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না! অলিক এসে দুই ব্যাগ রক্ত দিয়ে আবার দ্রুত চলে যায়.....
আজ অলিকের বিয়ে। অনেক অপেক্ষার পরও অত্রির কিছু মনে না পরায় মায়ের পছন্দেই সে বিয়ে করতে রাজী হয়ে গেল। সে চায়নি রিয়ান-অত্রির জীবনটা আর বিষিয়ে তুলতে......
কেবল কাবিননামায় সাইন করতে যাবে, এর মধ্য রিয়ান মিষ্টি নিয়ে দৌঁড়ে এলো। তারিন আর রিয়ানের পরীর মত একটা মেয়ে হয়েছে। সবাই আজ খুব খুশি।
অলিক বললো, কি নাম রাখবি ? রিয়ান সবাইকে মিষ্টি দিচ্ছে আর জোরে জোরে বলছে "মৌনতা".........আমার পরীর নাম মৌনতা। অলিকের হাত থেকে কলমটা পরে গেল................!!
###সমাপ্ত
By -Asad_Rahman
বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০১৯
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন