পরদিন রাস্তায় দেখা হল।
"কিছু ভেবে বের করলে, ডারলিং?"
"আমাকে এ জাতীয় সম্বোধন করবে না! তোমার মুখ থেকে এ জাতীয় শব্দ শুনতে ঘেন্না লাগছে......। আর হ্যাঁ, উত্তর খুঁজে পেয়েছি।"
কথাটি শেষ করেই... ও আমার দুইহাত ধরে বলল,
" আমাকে ভালবাসবে?"!!!
এক মূহুর্তের জন্য মনে হল আমি জিতে গেছি, তারপর নির্মম সত্যটা বুঝলাম, ও আসলে আমার আচরণটাই আমাকে দেখাল!! আমার হাত ছেড়ে দিয়ে মিহি গলায় বলল...
"এই কাজটাই তো তুমি করতে চাইছিলে? তাই না 'ডারলিং'?!"
"...আমার হাতে গড়া সেরা মানস প্রতিমা তুমি!! মনে রেখো...এতো সহজে আমি হাল ছাড়ছি না। আবার ফিরবো কোনো একদিন........."
"হয়তো কোনো একদিন আমিও তোমাকে ভালোবাসব......, কে বলতে পারে? জীবন তো অনিশ্চয়তা নিয়েই......তুমিই তো বলতে...।"
তারপর সে মিশে গেল জন অরণ্যে, আমার সব ভালোবাসা, কামনা আর ব্যর্থতাকে সাথে নিয়ে! আশা ছিল ও আমার শেষের কথাগুলি মনে রেখেছে...! আমি যতোই মিথ্যেবাদী হই না কেন; ফিরে আসার ব্যাপারটা সত্যি বলেছিলাম।
ফিরে আসার পর
কিছু কিছু বিষয়ের জন্য সময় দিতে হয়, কিন্তু অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছিল না, তারপর অপেক্ষা করতে হল! ওর সাথে জিততে হলে আমার যুক্তি খাড়া করতে হবে! অবশেষে একদিন মনে হল আমার প্রস্তুতি শেষ হয়েছে, কিন্তু মন কেন যেন সায় দিচ্ছিল না!
"কেন করছি এসব?"
......মন পাল্টাতেও সময় নিল না! ওকে ফোন করলাম।
"হ্যালো, কে? শীনা?"
"হাই- এলান, কেমন আছ?"
"ভাল...,। তুমি?"
"মনে হয় ভালই। কাজ নিয়ে একটু ঝামেলায় আছি...। যাইহোক..., ঠীক হয়ে যাবে। তোমার প্রজেক্টের খবর কি?"
"আমার প্রজেক্ট মানে?! আমিতো কোনো প্রজেক্ট করছি না!"
" হায়রে......অবোধ! ...আমাকে না তোমার বোঝানোর কথা? যে আমি তোমাকে ভালোবাসি?! সেই প্রজেক্টের কথা বলছি!"
"প্রতিবার ই কি আমাকে খোঁচা মেরে কথা শুরু করতে হবে?"
"কিন্তু তুমি তো আমাকে এভাবেই বেশী পছন্দ করো, তাই না?!"
"হ্যাঁ, হয়তবা। ...একসময় ঝগড়া করতেই বেশী ভাল লাগত। কিন্তু এখন না। এখন আমি শুধু তোমাকে চাই, অথবা তোমার আত্মাকে!"
"আমি ভুল শুনছি নাতো?! তুমি আবার কবে থেকে আত্মা-ফাত্মায় বিশ্বাস করতে শুরু করলে?!"
"আমি এখনও আত্মায় বিশ্বাস করিনা। মন বললেও হয়, মেয়েরা মনের চাইতে "আত্মা" শুনতে পছন্দ করে বেশি!"
"আচ্ছা?! তাহলে মেয়েরা কি চায় এ সম্পর্কে খুব ভাল ধারণা হয়েছে মনে হচ্ছে?"
"হ্যাঁ, চিন্তার জন্যে অনেক সময় পেয়েছিলাম কিনা!"
"মানুষ কে কিভাবে ঠকানো যায়...... এই সব নিয়েকি আসলেই তুমি এত সময় নষ্ট কর?!"
"মানুষ বলতে যদি তোমাকে বুঝাও, তাহলে বলব ঠিক ধরেছো!"
"তোমার বুদ্ধি দেখছি দিনে দিনে বাড়ছে!"
"ধন্যবাদ"
"হাহ!!! তুমি এখনও আগের মত নির্বোধ ই আছো! এখনও প্রশংসা শুনলে গলে যাও! "
"এতোটা নিশ্চিত হলে কিভাবে? ধন্যবাদটা তোমাকে অন্য কারণেও তো দিতে পারি?"
"হাহ!! তোমাকে আমার চাইতে ভাল কে জানে?!!পারলে কিছু শেখ আমার কাছ থেকে!! কোনো প্রশংসায় গলে যেও না। প্রশংসা মানুষকে দুর্বল আর অহংকারী করে দেয়, যার কারণে সে বোকার মতো পদক্ষেপ নেয়।"
"চমৎকার! এখন দেখি তুমি আমাকে শেখাচ্ছ? এক সময় আমার কাছ থেকে তুমি শিখতে!"
"শুন, তুমি জান আমি তোমাকে কেন বলেছি! আমাকে তুমি- এভাবেই দূর্বল করে তুলেছিলে এক সময়!"
"তুমি মনে হয় আমাকে আগের চাইতে একটু বেশী পছন্দ করছো?"
"তাতে তোমার কোনো ফায়দা নাই!"
মরিয়া হয়ে গলাটা একটু কাঁপাকাঁপা করে বললাম," কেন তুমি আমাকে চাও না? আমিকি অনেকের চাইতে ভাল না?"
"হ্যাঁ ভাল। কিন্তু তুমি নিজেকে যা ভাব তা তো তুমি নও! তাই যদি হতে, আমি অবশ্যই তোমার প্রেমে পড়তাম।"
"আমার কমতি কোথায় বলো?!!"
"সেটা তুমি নিজেই ভেবে বের করো। আমি গেলাম এখন, আমার কাজ আছে, বাই- আর কিছু শুনতে ইচ্ছে করছে না"
"প্লিজ, ফোনটা রেখে দিও না।..তোমার সাথে আমার কথা বলা প্রয়োজন!"
"এতক্ষণ তো আমার সাথেই কথা বলছিলে? ...নাকি?.."
"জোক কোরো না! এটা আমাকে মানায়। খুব সিরিয়াস বিষয়ে আলাপের সময়ও আমি জোক করতে পারি...। কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে না! আমি তোমার সাথে কিছু সিরিয়াস আলাপ করতে চাই......সামনা সামনি। তুমি কি আমার বাসায় আসবে?"
"কখন?"
"আমি ফোনে তোমাকে জানিয়ে দিবো।"
"সেটাই!!! আমার সামনা সামনি হবার আগে তোমার ভাবনা চিন্তার জন্য সময় তো লাগবেই!"
"তুমি যদি সেভাবেই ভাবতে পারো....তো, ধরে নাও সেটাই!!"
"আমার ভাবতে পারা না পারার কিছু নেই, আমি এভাবেই ভাবি, বুঝলে?!! তুমি বরং এখন থেকে ভাবতে শুরু করো কি বলবে!! তোমার মিষ্টি মিষ্টি ভালোবাসার কথায় যে কাজ হবেনা, এটা তো অন্তত বুঝেছো? বাই"
ও ফোনটা রেখে দিল!
মুখোমুখি
অবশেষে আবার দেখা হোলো! ও আমার বাসায় আসলো। ঠিক দুপুরবেলা। হালকা নাস্তা সেরে নিলাম। আমি একটা সিগারেট ধরালাম।
ভেবেছিলাম মানা করবে, ও সিগারেট একেবারেই সহ্য করতে পারেনা। ভেবেছিলাম একটু উত্যক্ত হবে! কিন্তু হতাশ হতে হলো- এ ব্যাপারে ও কোন ভ্রুক্ষেপ ই করল না! কিছু একটা তো হয়েছে...! মনের ভেতরটা খুত খুত করতে লাগলো। কিন্তু এটা হয়তো ওর একটা চাল ও হতে পারে!! ও চাইছে আমি যেন ওর কাছে কারণটা জানতে চাই!! একটু বিভ্রান্তিতে পরে গেলাম, সাবধানে কথা বলতে হবে!! জানতে চাইলাম-
"আজকেও কি কাঠখোট্টা ভাবে কথা বলবে ?"
"নাহ! আজকে মনটা ভালো আছে, আজকে হয়তো আহ্লাদ করেই কথা বলবো....।!"
"কারণটা বলা যাবে?"
"অবশ্যই!! সিডনিকে জানিয়ে দিয়েছি- আমি বিয়েতে রাজী।"
"ভালো খবর!! আমারও একটা সুসংবাদ আছে! আমি মাত্রই ক্লারাকে জানালাম ওকে বিয়ে করতে চাই।"
"বাহ! বেশ ভালো!! তাহলে অবশেষে তোমার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছি আমি?"
"এতো নিশ্চিত হয়ো না!! বিয়ের পরও আমি তোমাকে পাবার চেষ্টা করে যেতে পারি!! তুমি তো আমাকে চেনই!"
"পাগলামি করে লাভ নেই! সিডনি তোমার হাড্ডি একটাও আস্তো রাখবে না!!"
"সিডনি? ঐটা তো একটা ......বেজন্মা। একটা আঙুল না নাড়িয়েও ওকে আমি টুকরা টুকরা করে ফেলতে পারি!!"
"তুমি ভুলে গেছো তুমি ওর অধীনে চাকরি করো!"
"কে পরোয়া করে? আমি ক্লারা'র কোম্পানিতে অন্য চাকরিতে ঢুকে পরবো!"
"তোমার বউএর অধীনে চাকরি করবে?!! তুমি এতো নিরীহ স্বামী নিশ্চই নও!! নাকি?"
"আমি কোন কিছুই না! আবার সবকিছুই হতে পারি!"
"তুমি একটা বিরক্তিকর মশার চাইতে বেশী কিছু না!"
"কিন্তু আমি তোমাকে বিরক্ত করে তুলতে পারি, তাই না?এটাই আমার পছন্দ!"
"তোমার এই ভ্যানভ্যানানির শেষ আমি করতে চাই!"
"কিভাবে? পুলিশ ডেকে এনে?"
"আমাকে ভেঙ্গানোর চেষ্টা কোরোনা! শয়তানের ১০০ তরিকা থাকতে পারে। কিন্তু মেয়েদের ২০০ তরিকা জানা আছে! তুমি হয়তো নিজেকে বড় শয়তান মনে করতে পারো, কিন্তু আমিও নিজেকে শয়তানের যম মনে করি!!"
"নিজেকে এতো বড় ওস্তাদ মনে কোরোনা!"
"তোমার কাছ থেকেই শেখা!"
"আমার কাছ থেকে তোমার আরো কিছু শেখা বাকি থেকে গেছে! মিথ্যা বলতেও সাহস লাগে!! আমি জানি, তুমি সিডনিকে কিছুই জানাওনি। তুমি আসার আগে আমি তাকে ফোন করেছিলাম তোমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে! সে বল্লো - তুমি তাকে এখনো "না " বলে যাচ্ছো।"
"তুমি নিজে কি?!! আরো বড় মিথ্যুক!! ক্লারা সকালে আমাকে ফোন করে জানালো, তুমি নাকি ওকে অনুরোধ করেছো, যাতে আমি জিজ্ঞাসা করলে ও বলে যে তোমরা বিয়ে করতে যাচ্ছো!! এটা শুনেই আমিও ঠিক করলাম সিডনির ব্যাপারটা তোমাকে বলবো, যাতে তুমি বুঝতে পারো তোমার চাইতেও চালাক কেউ হতে পারে! "
"এতে চালাকির কি দেখলে? আমরা দুজনেই মিথ্যে বলেছি। দুজনেই জানতাম যে মিথ্যে বলছি! আমার চাইতে বেশী চালাকির কিছু তো করতে পারলে না!"
"তাতে কি ? তোমার সাথে তাল মিলিয়ে তো যেতে পারলাম?! তুমি আমার পিছু না ছাড় তাহলে একসময় আমি তোমাকে ঠিক ই দেখিয়ে দিবো আমি কিভাবে চাল চালতে পারি!! আমি এখন উঠবো। আর হ্যাঁ, এই ধরণের চালিয়াতি আর করতে যেয়ো না! আরেকটু সৎ থাকার চেষ্টা কোরো। ঠিক আছে?"
"চিন্তা কোরোনা! যদি সততা দিয়ে তোমাকে পাওয়া যায়, তাহলে আমার চাইতে সৎ আর কাউকে পাবে না!"
শীনা ঘর থেকে হেটে বেরিয়ে গেলো! পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে গেছে বুঝতে পারছি!!
কি করবো আমি এখন?

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন