বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

আসাদ ও ফারহানার অসমাপ্ত প্রেমকাহিনি পর্ব ৩: ফারহানার বিয়ে, আসাদের অপেক্ষা

১. যে খবরটা আসাদকে নীরব করে দিল সেদিন সন্ধ্যায় আকাশটা মেঘলা ছিল। আসাদ ফোন হাতে বসে ছিল, যদি ফারহানার একটা মেসেজ আসে। হঠাৎ ফারহানার একটা মেসেজ এল। ফারহানা: “আসাদ, তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।” আসাদ: “বলো, ফারহানা। তোমার কথা শোনার জন্য আমি সব সময় অপেক্ষা করি।” অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না। তারপর ফারহানা লিখল— “আমার বিয়ে ঠিক করেছে পরিবার। ছেলেটা অন্য জায়গার। আমি জানি না কী করব, আসাদ। সবকিছু আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।” মেসেজটা পড়ে আসাদ কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। যে মানুষটাকে নিয়ে সে একদিন নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিল, সেই মানুষটার জীবন এবার অন্য কারও সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার পথে। তার অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল। বলতে ইচ্ছে করছিল, “আরেকবার চেষ্টা করো, ফারহানা। আমাদের ভালোবাসার জন্য আরেকবার চেষ্টা করো।” ফারহানা সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আসাদ তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিল, কত কথা জমে আছে দুজনের বুকে। আসাদ ধীরে জিজ্ঞেস করল, — “তুমি কি সত্যিই চলে যাবে?” ফারহানা নিচু স্বরে বলল, — “আমি জানি না, আসাদ। আমি শুধু জানি, আমার পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেবে না।” — “আর আমাদের এত দিনের ভালোবাসা?” ফারহানা চোখ নামিয়ে বলল, — “সব ভালোবাসার শেষ একসঙ্গে হওয়া হয় না।” আসাদ একটু থেমে বলল, — “আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু একটা কথা বলো, তুমি কি কোনো দিন আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই স্বপ্ন দেখেছিলে?” ফারহানা এবার তার দিকে তাকাল। — “দেখেছিলাম, আসাদ। তোমার সঙ্গে একটা ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর সেই স্বপ্নকে সত্যি করা এক নয়।” আসাদ আর কোনো প্রশ্ন করল না। বিদায় নেওয়ার আগে শুধু বলল, — “তোমার জীবন ভালো কাটুক, ফারহানা। আমার সঙ্গে না হলেও, তুমি যেন সুখী হও।” ফারহানা চলে গেল। আসাদ দাঁড়িয়ে রইল আরও কিছুক্ষণ। তার মনে হচ্ছিল, মানুষ কখনো কখনো কাউকে হারানোর আগেই হারিয়ে ফেলে—যখন বুঝতে পারে, তাকে আর নিজের ভবিষ্যতের অংশ করে রাখা সম্ভব নয়। ৩. বিয়ের দিন অবশেষে ফারহানার বিয়ের দিন চলে এল। চারদিকে সাজসজ্জা, আত্মীয়স্বজনের ভিড়, আনন্দ আর উৎসব। সবাই নতুন জীবনের শুরু উদ্‌যাপন করছিল। কিন্তু শহরের অন্য এক প্রান্তে আসাদ চুপচাপ বসে ছিল। তার ফোনে ফারহানার পুরোনো মেসেজগুলো রয়ে গেছে। সেই ছোট্ট কথাগুলো, যেগুলো একসময় তার পুরো দিনটা সুন্দর করে দিত। সেদিন আসাদ কোনো অভিযোগ করল না। কাউকে কিছু বোঝানোর চেষ্টাও করল না। শুধু মনে মনে বলল, “ফারহানা, তোমাকে পাওয়া হয়তো আমার ভাগ্যে ছিল না। কিন্তু তোমাকে ভালোবেসেছিলাম—এটা আমার জীবনের সত্যি। তোমার নতুন জীবন ভালো হোক।” তারপর ফোনটা পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। আসাদের মনে হলো, কিছু বৃষ্টি শুধু আকাশ থেকে নামে না—কিছু বৃষ্টি মানুষের ভেতরেও নেমে আসে, যার শব্দ কেউ শুনতে পায় না। ৪. আসাদের অপেক্ষা সময় থেমে থাকে না। দিন পেরিয়ে মাস হলো। মাস পেরিয়ে বছর। আসাদ নিজের জীবন নিয়ে এগিয়ে চলতে শিখল। কাজ করল, মানুষের সঙ্গে মিশল, হাসলও। বাইরে থেকে তাকে দেখে কেউ হয়তো বুঝতেই পারত না, তার হৃদয়ে একটি অসমাপ্ত গল্প রয়ে গেছে। তবু কিছু সন্ধ্যায় ফারহানার কথা মনে পড়ত। কোনো পরিচিত গান শুনলে, পুরোনো কোনো রাস্তা দিয়ে হাঁটলে, কিংবা হঠাৎ ফোনের গ্যালারিতে পুরোনো স্মৃতি চোখে পড়লে। সে জানত না, ফারহানা তাকে মনে রেখেছে কি না। সে জানত না, ফারহানা তার নতুন জীবনে সুখী কি না। আর সে জানত না, কোনো দিন তাদের আবার দেখা হবে কি না।তবু আসাদের অপেক্ষাটা ছিল অন্য রকম। সে ফারহানার জীবন থামিয়ে রাখতে চাইত না। তার কাছে ফিরে আসার কোনো দাবি ছিল না। সে শুধু নিজের স্মৃতির ভেতর সেই মেয়েটাকে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল, যে একদিন তাকে শিখিয়েছিল—কাউকে ভালোবাসা মানে শুধু তাকে পাওয়া নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে দূর থেকে তার ভালো থাকার কামনা করাও। ৫. শেষ হয়েও যে গল্প শেষ হলো না বহু বছর পর এক রাতে আসাদ নিজের ডায়েরিতে লিখল— প্রিয় ফারহানা, জানি না তুমি কোনো দিন এই চিঠি পড়বে কি না। হয়তো তোমার জীবনে এখন অনেক নতুন গল্প, নতুন মানুষ, নতুন দায়িত্ব। হয়তো আমার কথা তোমার আর মনেও পড়ে না। কিন্তু আমার জীবনের একটা সময় ছিল, যেখানে তোমাকে ঘিরেই আমার সমস্ত স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল। সেই সময়টাকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি—তোমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য নয়, তোমাকে আমার করে পাওয়ার আশায়ও নয়। আমি অপেক্ষা করছি সেই দিনের, যেদিন তোমার স্মৃতি মনে পড়লেও আমার চোখে কষ্টের বদলে শুধু মায়া থাকবে। তুমি ভালো থেকো, ফারহানা। আমাদের গল্পটা অসমাপ্ত থাকুক। সব গল্পের শেষ অধ্যায় একসঙ্গে লেখা হয় না।” চিঠিটা লিখে আসাদ ডায়েরি বন্ধ করে দিল। তারপর জানালার বাইরে তাকাল। আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে। হয়তো ফারহানাও সেই একই চাঁদ দেখছিল—কোনো এক অজানা শহরে, নিজের নতুন জীবনের ভেতর। তারা দুজন দুদিকে, অথচ একসময় একই স্বপ্নের অংশ ছিল। কিছু ভালোবাসা বিয়েতে পূর্ণতা পায়। আর কিছু ভালোবাসা স্মৃতিতে বেঁচে থাকে—কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই, কোনো দাবি ছাড়াই, শুধু একসময়ের সত্যি হয়ে। আসাদ অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সে বুঝেছিল, অপেক্ষার সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি সব সময় ফিরে পাওয়া নয়—কখনো কখনো নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়াও।

কোন মন্তব্য নেই: